বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৩২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

গ্রীসের নগর-রাষ্ট্র

১১ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 গত চিঠিতে তোমাকে গ্রীকদের কথা কিছু কিছু বলেছি। তাদের সম্বন্ধে ভালো করে জানতে হলে আরও একটু আলোচনা করা দরকার। অবশ্য যাদের আমরা কখনও চোখে দেখি নি তাদের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করা বড়ো শক্ত। কারণ বর্তমান যুগে এবং প্রচলিত জীবনপ্রণালীতে আমরা এত বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, সুদূর অতীতের সেই ভিন্ন জগৎটাকে আমরা কিছুতেই কল্পনায় আনতে পারি না। অথচ ভারতবর্ষেই বলো আর চীন কিংবা গ্রীস দেশেই বলো, প্রাচীনকালে দুনিয়াটা সর্বত্রই অন্যরকম ছিল। সেই প্রাচীন যুগের লোকদের সম্বন্ধে কিছু জানতে হলে এখন কল্পনার সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় নেই—তাদের লেখা বই, তাদের ঘরবাড়ি কিংবা ভগ্নাবশেষ দেখে যা একটু-আধটু অনুমান করা যায়।

 গ্রীস দেশ সম্বন্ধে সর্বাগ্রে একটি কথা উল্লেখযোগ্য। বড়ো বড়ো রাজ্য কিংবা সাম্রাজ্য গ্রীকদের পছন্দ ছিল না। তাদের ছিল এক-একটি নগর নিয়ে এক-একটি রাষ্ট্র অর্থাৎ প্রত্যেক নগরই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেগুলো আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যৎসামান্য তার পরিধি—মাঝখানে শহর; চারদিকে কিছু ফসলের জমি, তাই থেকে নগরবাসীদের খাদ্যসংগ্রহ হত। গণতন্ত্র কাকে বলে সে তো তুমি জানোই—তাতে কোনো রাজা থাকে না। এইসব গ্রীক রাষ্ট্রেও ছিল না। রাজ্য শাসন করত ধনী নাগরিকের দল। শাসনব্যবস্থায় জনসাধারণের বলতে গেলে কোনোই হাত ছিল না। অনেকে ছিল আবার ক্রীতদাস, তাদের তো কোনোরকমের অধিকারই ছিল না। তা ছাড়া স্ত্রীলোকেরাও শাসনাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। কাজেই এসব রাষ্ট্রে খুব অল্পসংখ্যক লোকই নাগরিকের অধিকার ভোগ করত অর্থাৎ শাসনসম্পর্কীয় ব্যাপারে ভোট দিতে পারত। সংখ্যায় অল্প বলে প্রয়োজনের সময় সকলে এক জায়গায় জড়ো হয়ে ভোট দেওয়া এদের পক্ষে কঠিন ছিল না। ছোটো ছোটো নগররাষ্ট্র বলেই এটি সম্ভব হয়েছিল, বিরাট দেশ হলে এটা অসম্ভব হত। আর এখন, সারা ভারতবর্ষের কথা না-হয় ছেড়েই দাও, এক বাংলা কিংবা আগ্রা প্রদেশের সব ভোটদাতা এক জায়গায় একত্র হলে কী বিরাট ব্যাপার হয় একবার ভেবে দেখো দেখি। সে রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার! পরবর্তী কালে এটা অনেক দেশেই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষে ভেবে-চিন্তে একটা সমাধান স্থির হল—তাকে বলা চলে প্রতিনিধিমূলক শাসনতন্ত্র। তার মানে, তেমন কোনো জরুরি ব্যাপার দেখা দিলে দেশসদ্ধ লোককে এক জায়গায় জড়ো হয়ে উপায় বাৎলাতে হবে না, নিজেদের মধ্যে কয়েকজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে নিলেই চলবে। তারাই প্রয়োজনের সময় মিলিত হয়ে দেশের সব বিধি-ব্যবস্থা স্থির করবে, আইনকানুন তৈরি করবে। এইরকম ব্যবস্থা হলে সাধারণ ভোটদাতারাও পরোক্ষভাবে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

 কিন্তু গ্রীস দেশে এ রীতি প্রচলিত ছিল না। নগর-রাষ্ট্র ছাড়া বহুবিস্তৃত রাজ্য তাদের ছিলই না, কাজেই এ সমস্যাও তাদের দেখা দেয় নি। অবশ্য তোমাকে আগেই বলেছি, গ্রীকরাও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল—দক্ষিণ-ইতালি, সিসিলি এবং ভূমধ্যসাগরের উপকূলে ভাগে; কিন্তু তাই বলে সাম্রাজ্যস্থাপনের চেষ্টা কিংবা সমস্ত দেশকে এক-শাসনের অন্তর্গত করবার চেষ্টা তারা কখনও করে নি। তারা যেখানে গিয়েছে সেইখানেই তার নগর-রাষ্ট্র স্থাপন করেছে।

 একটু লক্ষ্য করলে দেখবে প্রাচীন কালে ভারতবর্ষেও ছোটো ছোটো গণতান্ত্রিক রাজা ছিল, অনেকটা ঠিক গ্রীক নগর-রাষ্ট্রের মতো। কিন্তু সেগুলো বেশি দিন স্থায়ী হয় নি, বৃহত্তর রাজ্য এসে তাদের গ্রাস করেছে। তা হলেও আমাদের গ্রাম্য পঞ্চায়েতগগুলির ক্ষমতা তার পরেও বহু দিন অবধি টিঁকে ছিল। বোধ করি, প্রথম দিকে আর্যদের ছোটো ছোটো নগর-রাষ্ট্র স্থাপনের দিকেই ঝোঁক ছিল। ক্রমে নানা দেশের প্রাচীনতর সভ্যতার সংস্পর্শে এসে কিংবা হয়তো ভৌগোলিক