এশিয়া ও ইউরোপ দুই মহাদেশেরই উত্তরভাগ ছিল প্রচণ্ড শীতের দেশ। সেই বরফের যুগে তুষারের বিরাট বিরাট ঢেউ মধ্য-ইউরোপের বিস্তীর্ণ প্রান্তর অবধি প্রবল বেগে নেমে আসত। সে সময় ও দেশে হয়তো মানুষের বসতিই ছিল না, আর থাকলেও তাদের ঠিক মানুষ বলা যেত কি না সন্দেহ। তুমি হয়তো ভাবছ সেই দূর অতীতে বরফের নদী ছিল কি না-ছিল সে সম্বন্ধে আমরা জানলাম কী করে। সে যুগে লেখক ছিল না, বই ছিল না, সুতরাং ইতিহাসও ছিল না; এ সবই সত্যি। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না—প্রকৃতি দিনের পর দিন, মাটির উপর, পাথরের উপর, যে ইতিহাস লিখে যায় তা পড়তে জানলেই পড়া যায়। এ যেন পৃথিবীর আত্মজীবনী। তুষারনদীর ওই একটি ধরন আছে, সে যেদিক দিয়ে যায় সেই পথে তার ধারার একটা চিহ্ন এঁকে রাখে। একবার যদি চিনে নিতে পারো তা হলে এই চিহ্ন দেখলেই বরফের স্রোতের গতিপথ আবিষ্কার করতে পারবে। আর চিনে নেওয়া খুব যে বেশি কষ্টসাধ্য তাও নয়। হিমালয় বা আল্প্স্ অঞ্চলে যেখানে তুষারনদী আছে সেখানে একবার গেলেই বুঝবে। তুমি তো আল্প্স্ পর্বতে মঁ ব্লাঁ-র ধারে-কাছে বরফের নদী দেখেছ। এই বিশেষ চিহ্নগুলি তখন হয়তো তোমায় কেউ দেখিয়ে দেয় নি। কাশ্মীর এবং হিমালয়ের নীচে আরও অনেক জায়গায় চমৎকার বরফের নদী দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের পক্ষে পিণ্ডারি নদী সবচেয়ে কাছে—আলমোড়া থেকে হপ্তাখানেকের রাস্তা। খুব ছেলেবয়সে—তখন তোমার চেয়েও ছোটো—আমি একবার পিণ্ডারি দেখতে গিয়েছিলাম। সে দৃশ্য আমি এখনও ভুলি নি।
দেখো, অতীতের ইতিহাস থেকে কোথায় গিয়ে পড়েছি—একেবারে বরফের নদী পিণ্ডারিতে চলে এসেছি। মনগড়া কল্পনা নিয়ে খেলতে গেলে বারেবারে খেই হারিয়ে যায়। যদি সম্ভব হত তা হলে তোমার সঙ্গে মুখোমুখি বসে গল্প বলতাম আর তা হলে মাঝে মাঝে পথ ভুলে বেশ বরফের নদী প্রভৃতি জায়গায় মনে মনে বেড়িয়ে আসা যেত।
বরফের যুগের কথা বলতে গিয়ে বরফের নদীর কথা এসে গেল। বরফের নদী কেবল মধ্য-ইউরোপে নয়, ইংলণ্ড অবধি নেমে এসেছিল। এসব দেশে এখনও ধারাপথের চিহ্ন থেকে গেছে। অনেক দিনের পুরাতন শিলাখণ্ডের উপর এই চিহ্নগুলি দেখে মনে হয়, সে সময় ইউরোপের উত্তর ও মধ্য ভাগ খুবই ঠাণ্ডা ছিল। তার পর আবহাওয়া উষ্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গে এই নদীগুলি ক্রমশ শুকিয়ে শীর্ণ হতে থাকে। ভূতত্ত্ববিদ্রা, অর্থাৎ পৃথিবীর গঠনের ইতিহাস যাঁরা জানেন তাঁরা, বলেন যে শীতের যুগ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে একটা গরমের যুগ আসে। তখন ইউরোপের আবহাওয়া এখনকার চেয়েও গরম ছিল। এই উষ্ণ আবহাওয়ার ফলে ইউরোপে ঘন অরণ্য জেগে ওঠে।
আর্যদের অভিযান মধ্য ইউরোপ অবধি বিস্তৃত হয়েছিল। সেখানে সেই সময়টাতে তাঁরা উল্লেখযোগ্য এমন কিছু করেন নি যেজন্য তাঁদের স্মরণ করা যেতে পারে। গ্রীস ও ভূমধ্যসাগর-অঞ্চলের লোকেরা খুব সম্ভব উত্তর ও মধ্য-ইউরোপের লোকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। সভ্য লোকদের কাছে ওরা ছিল বর্বর। অরণ্যসংকুল উত্তর ও মধ্য ইউরোপের এই ‘বর্বর’ জাতিরা এদিকে কঠোর জীবনসংগ্রামে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে উত্তরোত্তর শক্তিশালী হয়ে উঠতে লাগল। শক্তিমান স্বাস্থ্যবান ও সাহসী এই নূতন জাতি, জীবন এদের কাছে যুদ্ধ। একদিন দক্ষিণ ইউরোপে নেমে এসে সেখানকার সভ্যজাতিদের সমস্ত শাসনব্যবস্থা ওলটপালট করে দেবার জন্য এই বর্বরেরা যেন ওৎ পেতে বসে ছিল। এটা ঘটে অনেক দিন পরে, সুতরাং এখানে সে কথা বলে লাভ নেই।
উত্তর-ইউরোপ সম্বন্ধে তবু তো কিছু জানা যায়—আমেরিকার মতো মহাদেশ ও আরও অনেক বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের প্রাচীন ইতিহাস একেবারেই অজ্ঞাত থেকে গেছে। বলা হয়, কলম্বস আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন। তা বলে এ কথা তো বলা চলবে না যে, কলম্বস আমেরিকায় পদার্পণ করবার আগে সে দেশে কোনো সভ্য লোকই ছিল না। সে যাই হোক, এ কথা সত্যি যে, আমরা যে সময়ের কথা বলছি সে সময়কার আমেরিকা সম্বন্ধে আমরা এখনও পর্যন্ত কিছু জানি না। এক মিশর ও ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণতীরবর্তী দেশগুলি ছাড়া আফ্রিকার প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধেই বা আমরা কতটুকু জানি। এ সময়টা মিশরের প্রাচীন ও গৌরবময় সভ্যতার হয়তো পড়্তি অবস্থা। কিন্তু তা হলেও মিশর তখনও অন্য অনেক দেশের তুলনায় ঢের বেশি উন্নত ছিল।