বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৩৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
পশ্চিম এশিয়ার সাম্রাজ্য
১৭

 এশিয়ায় তখন কী হচ্ছিল ভেবে দেখা যাক। এই মহাদেশে সভ্যতার মোটামুটি তিনটি কেন্দ্র ছিল—মেসোপটেমিয়া, ভারত ও চীন।

 মেসোপটেমিয়া, পারশ্য ও এশিয়া মাইনরে প্রাচীন কালে কত সাম্রাজ্যের উত্থানপতন ঘটেছে। আসীরীর, মীডীয়, বাবিলনীয় ও পারশিক প্রভৃতি সম্রাজ্য পর পর এসেছে ও ভেঙে গিয়েছে। এই সাম্রাজ্যগুলির পরস্পরের মধ্যে কী সম্বন্ধ ছিল, কখন একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধবিবাদ করেছে, আর কখনই-বা পাশাপাশি দুই রাজ্য পরস্পরের সহযোগী হয়ে শান্তিতে দিন কাটিয়েছে—এইসব খুঁটিনাটি ইতিহাসের মধ্যে গিয়ে কাজ নেই। গ্রীসের নগর-রাষ্ট্র ও পশ্চিম-এশিয়ার এই সাম্রাজ্যগুলির মধ্যে যে প্রভেদ সেটা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছ। এশিয়ার এই দেশগুলিতে গোড়া থেকেই একটা বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলার দিকে অদ্ভুত ঝোঁক দেখা যায়। এই প্রবল ইচ্ছেটার মূলে থাকতে পারে হয়তো ওদের প্রাচীনতর সভ্যতার প্রেরণা বা অন্যবিধ কারণ।

 ক্রীশাস্ রাজার কথা তুমি নিশ্চয়ই পড়ে থাকবে। ইংরেজিতে একটা প্রবচন আছে ‘ক্রীশাসের মতো ধনী’। তুমি হয়তো এও পড়েছ কীভাবে এই ধনী ও দাম্ভিক ক্রীশাসের মাথা হেঁট হয়েছিল। আজ যে দেশকে এশিয়া মাইনর বলা হয়, এশিয়ার পশ্চিম উপকূলের এই দেশকে তখনকার যুগে বলা হত লিডিয়া। ক্রীশাস্ ছিলেন লিডিয়ার রাজা। সমুদ্রের ধারে অবস্থিত বলে লিডিয়ায় ব্যবসাবাণিজ্য খুব ভালো চলত। সে সময় কাইরাসের অধীনে পারশ্য-সাম্রাজ্যের প্রভূত উন্নতি হয়। শক্তিশালী কাইরাসের সঙ্গে ক্রীশাসের সংঘর্ষ হয় ও ক্রীশাসের পরাজয় ঘটে। পরাজিত লাঞ্ছিত হয়ে ক্রীশাসের অশেষ দুর্গতি ঘটে ও তারই ফলে তাঁর জ্ঞানোন্মেষ হয়, তিনি সত্যাসত্য বুঝতে শেখেন। এইসমস্ত কথা গ্রীক ইতিহাসরচয়িতা হিরোডটাস লিখে গিয়েছেন।

 কাইরাসের সাম্রাজ্য ছিল বহু দূরবিস্তৃত—পূর্বদিকে ভারতের সীমা অবধি তাঁর ছিল অখণ্ড প্রতাপ। দারিয়ুস-নামে কাইরাসের পরবর্তী একজন সম্রাটের রাজত্বকালে এই সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হয়। মিশর, মধ্য-এশিয়ার একটি অংশ, এমনকি সিন্ধুনদের কাছাকাছি ভারতবর্ষের একটি অংশও তখন পারশ্য-সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। শোনা যায়, পারশ্যের এই ভারতীয় প্রদেশ থেকে দারিয়ুসের রাজস্বস্বরূপ প্রচুর পরিমাণে সোনা পাঠানো হত। তখনকার দিনে খুব সম্ভব সিন্ধুনদের বেলাভূমিতে স্বর্ণ-রেণু পাওয়া যেত। এখন আর তা পাওয়া যায় না, বরঞ্চ প্রদেশের এই অংশের বেশির ভাগই আজকাল পতিত জমি। এই থেকেই বোঝা যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়াও বদলে গিয়েছে।

 ইতিহাস পড়তে গিয়ে অতীতের অবস্থার সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করতে গেলে দেখবে, মধ্য-এশিয়াতে যেরকম ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটেছে তেমন বোধ হয় আর কোনো দেশে ঘটে নি। এই দেশ থেকে কত দল, কত জাতি ও উপজাতি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে তার সীমাসংখ্যা নেই। এই দেশে প্রাচীন কালে কত জনবহুল সমৃদ্ধিশালী শহর গড়ে উঠেছিল। আজকের দিনের কলকাতা কিংবা বোম্বাই শহরের চেয়েও বড়ো ছিল এইসব নগরী, ইউরোপের বড়ো বড়ো রাজধানীর সঙ্গে এদের অনায়াসে তুলনা করা চলে। তখন মধ্য-এশিয়ার এইসব শহর ছিল গাছপালায় সবুজ, চারদিকে বাগবাগিচা, আবহাওয়া ছিল নাতিশীতোষ্ণ। সেদিন আর নেই। এখনকার দিনে এই অঞ্চলে খুব কম লোকেরই বসবাস—লতাগুল্মহীন শুষ্ক মরুপ্রান্তরের মতো এর চেহারা। অতীতের দু-একটি শহর এখনও দাঁড়িয়ে আছে, যেমন ধরো সমরকন্দ্ ও বোখারা। এ শহরদুটির নাম শুনলেই মনে কত-না ছবি জেগে ওঠে। এদের প্রাচীন গৌরব আর নেই, যেন অতীতের ছায়ামাত্র।

 ওই দেখো, আগেভাগে সব কথা বলে ফেলছি। আমি যে সময়কার কথা বলছি তখন না ছিল সমরকন্দ্ না ছিল বোখারা। এরা তখন ভবিষ্যতের অবগুণ্ঠনে ঢাকা। মধ্য-এশিয়ার গৌরবময় উত্থান ও তার পর তার পতন ঘটে আরও অনেকদিন পরে।