৯
ঐতিহ্যের বোঝা
১৪ই জানুয়ারি, ১৯৩১
জেলে এসে অবধি আমার কতকগুলো নূতন অভ্যাস হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, খুব ভোরে ওঠা, এমনকি ভোর হবার অনেক আগেই। গত গ্রীষ্মকাল থেকে এ অভ্যাসটি করেছি। ধীরে ধীরে ভোরের আলো দেখা দিচ্ছে আর একটি একটি করে তারার আলো নিব্ছে—বসে বসে তাই দেখতে বেশ লাগত। ঠিক ভোর হবার আগে তুমি চাঁদের আলো কখনও দেখেছ? আকাশের রঙ বদলে আস্তে আস্তে কেমন করে দিনের আলো দেখা দেয়! আমি কতদিন যে বসে বসে এই চাঁদের আলো আর ভোরের আলোর সংঘর্ষ দেখেছি। শেষ পর্যন্ত ভোরের আলোই বরাবর জিতে যায়। আধো-আলো আধো অন্ধকারের মায়ালোকে বেশ কিছুক্ষণ বোঝাই যায় না, সেটা ঠিক চাঁদের আলো, না, নবাগত দিনের আলো। তার পরে অকস্মাৎ কখন অন্ধকারের কুহেলি ভেদ করে স্পষ্ট দিবালোক দেখা দেয়, আর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চাঁদ মলিন মুখে বিদায় নেয়।
অভ্যাসমতো আজও খুব সকালে উঠেছি, আকাশে তখনও তারা দপদপ করছে। কিন্তু আকাশে বাতাসে এমন একটা অস্পষ্ট আভাস ছিল, মনে হচ্ছিল ভোর হতে আর বেশি বিলম্ব নেই। বসে বসে পড়ছিলাম। হঠাৎ ভোরের নিস্তব্ধ প্রশান্তি ভেদ করে দূরে মানুষের কণ্ঠস্বর এবং গাড়ির ঘড়্ঘড়ানি শুনতে পেলাম। শব্দ ক্রমেই বাড়ছে। মনে পড়ল, আজকে সংক্রান্তি, মাঘমেলার প্রথম দিন। হাজার হাজার স্নানার্থী ভোরবেলায় সংগমে স্নান করতে চলেছে, যেখানে গঙ্গা এসে মিশেছে যমুনার সঙ্গে, সরস্বতীও অদৃশ্য ভাবে এসে সেই ধারায় মিলেছে। দলে দলে চলেছে আর গান করছে, আর মাঝে মাঝে চীৎকার করছে ‘গঙ্গা মায়ীকি জয়’। নাইনি জেলের প্রাচীর ভেদ করে তাদের কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে পৌঁচচ্ছে। বসে বসে শুনেছি আর ভাবছি, ভক্তি-বিশ্বাসের কী অসীম ক্ষমতা—অসংখ্য মানুষকে টেনে এনেছে এই নদীর ধারে। কিছুক্ষণের জন্য অন্তত এরা এদের দুঃখ দারিদ্র্য ক্লেশ, সব ভুলে গিয়েছে। ভাবছিলাম, বছরের পর বছর, কত সহস্র বছর ধরে তীর্থযাত্রীর দল এই ত্রিবেণী সংগমে এসে জড়ো হয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ এসেছে আর গেছে; কত রাজ্য, কত সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, আবার অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেই পুরাতন ঐতিহ্যের ধারা সমানভাবে চলছে। বংশানুক্রমে মানুষ তার কাছে মাথা নত করেছে। এই-যে কালের ধারা, এর মধ্যে ভালো জিনিষ অনেক আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে এটাও একটা নিদারণ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাতে করে আমাদের অগ্রগতিতে বাধা পড়ে। অবশ্য এটা ভাবতে বেশ লাগে যে, একটা কোনো অদৃশ্য সূত্রে আমরা আমাদের বিস্মৃতপ্রায় অতীতের সঙ্গে বাঁধা রয়েছি। তেরো শো বছর পূর্বে এই মেলার যে ইতিহাস লেখা হয়েছিল তাও পড়তে বেশ লাগে। অবশ্য তারও বহু যুগ আগে এই মেলা আরম্ভ হয়েছিল। কিন্তু এই-যে সূত্রটার কথা বলেছি, সেটা কেমন যেন শিকল হয়ে আমাদের চলবার পথে বাধা দেয়। তখন মনে হয় আমরা যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যের কবলে পড়ে বন্দী হয়ে আছি। অতীতের সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষা করতেই হবে, কিন্তু সেই অতীত যদি কারাগার হয়ে আমাদের অগ্রগতিতে বাধা দেয় তবে আবার কারাগার ভেঙে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।
আমার গত তিনটি চিঠিতে তোমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছি, আড়াই হাজার, তিন হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল। কোনো সন-তারিখের উল্লেখ আমি করি নি, ওসব আমার পছন্দ নয়। তুমিও এ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাও এ আমি চাই না। তা ছাড়া সেই প্রাচীন কালে কখন কী ঘটেছে তার সঠিক তারিখ বার করাও বড়ো সহজ নয়। পরে হয়তো কিছু কিছু সন-তারিখ দেবার দরকার হবে। তাতে কোন্ ঘটনার পর কোন্ ঘটনা ঘটল মনে রাখা