বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৩৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ঐতিহ্যের বোঝা
১৯

সহজ হবে। আপাতত শুধু প্রাচীন কালের পৃথিবী সম্বন্ধে তোমাকে একটা মোটামুটি ধারণা দেবার চেষ্টা করছি।

 ইতিমধ্যে গ্রীস, ভূমধ্যসাগর, মিশর, এশিয়া মাইনর ও পারশ্য সম্বন্ধে আমাদের খানিকটা ধারণা হয়েছে। এবার আমাদের নিজের দেশে ফিরে আসা যাক। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে প্রথমদিকটাতে বড়ো মুশকিলে পড়তে হয়। প্রাচীন যুগের আর্যেরা, যাঁরা ভারতে এসেছিলেন, তাঁরা কোনো ইতিহাস লিখে রেখে যান নি। নানা দিক থেকে তাঁরা যে কত উন্নত ছিলেন, সে কথা গোড়ার দিককার চিঠিগুলোতে আমি কিছু কিছু বলেছি। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি যেসব বই এঁরা লিখে গিয়েছেন সাধারণ লোকের পক্ষে তা লেখা কখনোই সম্ভব নয়। এসব বই এবং আরও কিছু উপাদান থেকে আমরা আমাদের অতীত ইতিহাস জানতে পারি। আমাদের পূর্বপুরুষদের রীতিনীতি, ভাবনাচিন্তা এবং তাঁদের জীবনপ্রণালী সম্বন্ধে অনেক কথা ঐ বই থেকে জানা যায়, কিন্তু এগুলোকে খাঁটি ইতিহাস বলা চলে না। খাঁটি ইতিহাস বলতে সংস্কৃত ভাষায় যে একখানিমাত্র বই আছে সেটি হল কাশ্মীরের ইতিহাস, তাও অনেক পরবর্তী কালের লেখা। এই গ্রন্থের নাম ‘রাজতরঙ্গিণী’। এটি কাশ্মীরের রাজাদের ইতিবৃত্ত। কহ্লননামক এক পণ্ডিত এই বই লিখেছিলেন। তুমি শনে সুখী হবে যে তোমার রণজিৎ পিসেমশাই[] এখন কাশ্মীরের সেই সুপ্রসিদ্ধ ইতিহাসখানি সংস্কৃত ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন। বিরাট গ্রন্থ, কিন্তু প্রায় অর্ধেক অনুবাদ হয়ে গেছে। সমস্ত অনুবাদ-গ্রন্থখানি যখন প্রকাশিত হবে,[] তখন আমরা সবাই খুব আগ্রহের সঙ্গে সেই বই পড়ব, কারণ মূল গ্রন্থ পড়বার মতো সংস্কৃত জ্ঞান আমাদের অনেকেরই নেই। একে তো বইখানি চমৎকার, তা ছাড়া কাশ্মীরের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে এতে অনেক কথা আছে। আর তুমি তো জানো, কাশ্মীরেই ছিল আমাদের আদিনিবাস।

 আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষ সভ্য ছিল। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে মোহেঞ্জোদারোতে যেসব ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে তার থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে আর্যদের আগমনের বহু পূর্ব থেকেই একটি অতি উন্নতধরনের সভ্যতা এ দেশে চলে আসছিল। তবে এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু আমরা এখনও জানি না। আর ক-বছরের মধ্যেই বোধ করি অনেক কিছু জানা যাবে। আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিকরা, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে যাঁরা ইতিহাসের তথ্য উদ্ধার করে থাকেন তাঁরা, মাটি খুঁড়ে যখন সব-কিছু বার করবেন তখন আরও অনেক কথা আমরা জানতে পারব।

 এ ছাড়াও বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতে তখন দ্রাবিড়দের একটি অতি উঁচুদরের সভ্যতা ছিল, এমনকি উত্তর ভারতেও ঐজাতীয় কিছু থাকা অসম্ভব নয়। দ্রাবিড়দের ভাষা আর্যদের সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত নয়। এদের ভাষা অনেক বেশি প্রাচীন এবং তাদের সাহিত্যও খুব সমৃদ্ধ। তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়ালম্—এসব হচ্ছে দ্রাবিড়দের ভাষা। দক্ষিণ ভারতে—বর্তমান মাদ্রাজ এবং বোম্বাই প্রদেশে—এখনও এইসব ভাষারই চলন। তুমি বোধ হয় জানো, আমাদের জাতীয় কংগ্রেস ভাষাগত পার্থক্য অনুযায়ী প্রদেশ ভাগ করেছে। ইংরেজ সরকার যেভাবে প্রদেশ গঠন করেছে তার চেয়ে এটা অনেক ভালো ব্যবস্থা। কারণ এর ফলে বিশেষ এক জাতের লোক, যারা এক ভাষায় কথা বলে, একই রকমের রীতিনীতি পালন করে, তারা সকলে এক প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। কংগ্রেসের বিভাগ অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতে অনেকগুলি প্রদেশ হবার কথা। এই যেমন মাদ্রাজের উত্তরভাগে হবে অন্ধ্র প্রদেশ—ওখানকার লোকের ভাষা হচ্ছে তেলেগু; তামিলভাষী লোকদের জন্য হবে তামিলনাদ প্রদেশ; বোম্বায়ের দক্ষিণে, যেখানকার লোক কানাড়ি ভাষায় কথা বলে, তাদের জন্য আলাদা প্রদেশ হবে কর্ণাটক; আর মালাবার অঞ্চলে, যেখানে মালয়ালম্ ভাষা প্রচলিত, সেখানে হবে কেরল প্রদেশ। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ভবিষ্যতে যখন ভারতবর্ষের প্রদেশ-বিভাগ হবে তখন প্রত্যেক অঞ্চলের ভাষার উপরেই খুব জোর দেওয়া হবে।


  1. শ্রীমতী বিজয়লক্ষী পণ্ডিতের স্বামী রণজিৎ পণ্ডিত, এই সময়ে তিনি লেখকের মতোই কারারুদ্ধ ছিলেন।
  2. পরে এই অনুবাদ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।