বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৩৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২০
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

 এই প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের প্রচলিত ভাষাগুলির সম্বন্ধে আরও একটা কথা বলে নেওয়া ভালো। ইউরোপে এবং অন্যত্রও কতক লোকের ধারণা, ভারতবর্ষে কয়েক শত বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। এটা নিতান্তই বাজে কথা, যারা এরকম বলে তারা নিজেদের মূর্খতাই প্রমাণ করে। ভারতবর্ষের মতো বিরাট দেশে অসংখ্য উপভাষা থাকা কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু সেগুলো আলাদা ভাষা নয়, স্থানবিশেষে একই ভাষার রূপান্তর মাত্র। তা ছাড়া অনেক পাহাড়ি জাত আছে কিংবা এখানে-সেখানে ছোটোখাটো সম্প্রদায় আছে যারা নিজেদের মধ্যে চলতি বিশেষ কোনো ভাষায় কথা বলে। কিন্তু সারা ভারতবর্ষ নিয়ে যখন কথা তখন দেখবে এসব ভাষার কোনো স্থানই নেই, এ সবই অবান্তর। কেবলমাত্র লোকগণনার বেলায় এসব ভাষার উল্লেখ হয়। বোধ করি আগের এক চিঠিতে তোমাকে বলেছিলাম যে, ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলি দুই শ্রেণীতে বিভক্ত—দ্রাবিড়ীয়, তার কথা এইমাত্র তোমাকে বলেছি, এবং আর্যভারতীয়। এই আর্য ভাষার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সংস্কৃত। এই গোত্রের অন্যান্য ভাষাগুলি সংস্কৃতেরই সন্তান—যেমন: হিন্দি, বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি। এদেরই সমগোত্রীয় আরও দু-একটা ভাষা আছে: আসামে অসমিয়া ভাষা, উড়িষ্যা বা উৎকলে ওড়িয়া ভাষা। উর্দু, হিন্দিরই রূপান্তর আর হিন্দুস্থানি বলতে হিন্দি উর্দু, দুইই বোঝায়। তা হলেই দেখতে পাচ্ছ ভারতবর্ষের প্রধান ভাষা হল ঠিক দশটি—হিন্দুস্থানি, বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়ালম, ওড়িয়া এবং অসমিয়া। এর মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা যে হিন্দুস্থানি তাই উত্তর ভারতের সর্বত্র প্রচলিত। পাঞ্জাব, যুক্তপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজপুতানা, দিল্লি এবং মধ্যভারতের সর্বত্র লোকে এই ভাষাতেই কথা বলে। এই বিস্তৃত অঞ্চলে প্রায় পনেরো কোটি লোকের বাস। তবেই তো দেখছ, পনেরো কোটি লোক এখনই হিন্দুস্থানি বলছে—স্থানবিশেষে একটু ভাষার অদলবদল আছে, এই যা। তা ছাড়া ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই লোকে হিন্দুস্থানি ভাষা বুঝতে পারে। খুব সম্ভব একদিন হিন্দুস্থানিই সর্বভারতের ভাষা হবে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, যেসব প্রধান প্রধান ভাষার নাম এইমাত্র করেছি সেগুলি একেবারে উঠে যাবে। প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে ওগুলো থাকবেই, বিশেষ করে যখন এদের চমৎকার সব সাহিত্য রয়েছে। যে ভাষা রীতিমতো উন্নতি লাভ করেছে সে ভাষা কোনো জাতির হাত থেকে কেড়ে নিতে নেই। কোনো জাতিকে বড়ো হতে হলে, তাদের সন্তানসন্ততিকে সুশিক্ষিত করতে হলে, নিজেদের ভাষার সাহায্যেই করতে হবে। ভারতবর্ষে তো এখন সব-কিছুই বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলেছে—আমরা নিজেদের মধ্যেও কথায়বার্তায় বেশির ভাগ বলি ইংরেজি। এই-যে আমি ইংরেজিতে তোমাকে চিঠি লিখছি, জানি এটা নিতান্তই হাস্যকর, তবু লিখছি। যাক গে, আশা করছি এ অভ্যাসটা শীগগিরই ছাড়তে পারব।

১০

প্রাচীন ভারতের গ্রাম্য পঞ্চায়েত

১৫ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 আমার এই প্রাচীনকালের ইতিবৃত্ত কিছুতেই এগোচ্ছে না। সোজা রাস্তায় না গিয়ে আমি ক্রমাগত অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গত চিঠিতে প্রকৃত বিষয়ের অবতারণা করতে গিয়ে আমি ভারতের বিভিন্ন ভাষা সম্বন্ধেই কেবল আলোচনা করেছি।

 প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এবার আসা যাক। আজ যাকে আমরা আফগানিস্তান বলি, অনেকদিন পর্যন্ত সে দেশ ভারতের অন্তর্গত ছিল। এই উত্তর-পশ্চিম অংশের প্রাচীন নাম ছিল গান্ধার দেশ। ভারতের উত্তরভাগে সিন্ধু ও গঙ্গা নদীর তীরবর্তী সমতলভূমিতে আর্যরা দলে দলে এসে বসতি স্থাপন করে। এদের অনেকে এসেছিল পারশ্য ও মেসোপটেমিয়া থেকে। সেই প্রাচীন