বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

সিংহাসন দখল করা বিচিত্র ছিল না। আর্যদের অবনতি ঘটবার সঙ্গে সঙ্গে জাতিভেদপ্রথা অটল সংস্কারে দাঁড়িয়ে গেল। নানা ভেদবিভেদের ফলে দেশ দুর্বল হয়ে পড়ল—তাদের স্বাধীনতার পূর্ব আদর্শও তারা ভুলে গেল। অথচ এককালে একটা কথাই ছিল—আর্য কখনও দাসত্ব স্বীকার করে না। ‘আর্য’ নামের অবমাননার চেয়ে তারা মৃত্যুকেও শ্রেয় জ্ঞান করত।

 আর্যদের নিবাসভূমি এই শহর ও গ্রামগুলি যেমন-তেমনভাবে গড়ে ওঠে নি। প্রত্যেকটি শহর ও গ্রাম গঠিত হত কোনো সুপরিকল্পিত প্রণালী অনুযায়ী। শুনলে অবাক হবে যে এই পরিকল্পনাগুলিতে জ্যামিতিক পদ্ধতি অনুসৃত হত। বৈদিক পূজা-অনষ্ঠানে দেখা যায় বেদি প্রভৃতি রচনায় অনেক ক্ষেত্রে জ্যামিতির ব্যবহার ছিল—এখনও অনেক হিন্দু পরিবারে পূজাপার্বণের সময় তার নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। গৃহ ও নগর-নির্মাণের সঙ্গে জ্যামিতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সেকালকার আর্য গ্রাম এক-একটি সুরক্ষিত শিবির, কারণ সর্বদাই তখন আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা। বহিঃশত্রুর আক্রমণ-আশঙ্কা না থাকলেও একই পদ্ধতি অনুসৃত হত—প্রস্থের চেয়ে দৈর্ঘ্যে বেশি চতুষ্কোণ একখণ্ড জমি, তার চারদিকে প্রাচীর, চারটি বড়ো চারটি ছোটো তোরণদ্বার, প্রাচীরাভ্যন্তরে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মিত পথ ও বাড়িঘর; গ্রামের ঠিক মাঝখানে পঞ্চায়েত-ঘর—গ্রামবৃদ্ধদের আলাপ-আলোচনার স্থান। ছোটো ছোটো গ্রামে পঞ্চায়েত-ঘরের পরিবর্তে একটা বড়ো গাছের তলায় মোড়লরা বসত। প্রতি বছর গ্রামবাসীরা মিলে পঞ্চায়েত নির্বাচন করত।

 অনেক জ্ঞানীগুণী লোক নগর বা গ্রামের সন্নিহিত কোনো অরণ্যে গিয়ে সরল জীবনযাত্রা যাপন করতেন বা শান্তভাবে জ্ঞানচর্চা ও কর্মে মনোনিবেশ করতেন। ক্রমে ক্রমে তাঁদের কাছে শিষ্যেরা এসে একত্র হত—এইভাবে এক-একজন গুরুকে কেন্দ্র করে এক-একটি আশ্রম গড়ে উঠত। এই তপোবনগুলিকেই সেকালকার বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে। এইসব বিদ্যালয়ে বড়ো বড়ো অট্টালিকার আড়ম্বর ছিল না, কিন্তু বহু দূর দেশ থেকেও বিদ্যার্থীরা এইরকম বিদ্যায়তনে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আসত।

 আমাদের ‘আনন্দভবন’[]এর ঠিক উল্টোদিকেই ভরদ্বাজ-আশ্রম। তুমি তো এই আশ্রম কতবার দেখেছ। তুমি হয়তো এও শুনে থাকবে যে ভরদ্বাজ-মুনি ছিলেন সেই প্রাচীন রামায়ণের কালের একজন জ্ঞানী। রামচন্দ্র বনবাসের সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। শোনা যায় হাজার হাজার শিষ্য ও ছাত্র তাঁর সঙ্গে তপোবনে বাস করত। ভরদ্বাজের অধ্যক্ষতায় একে পুরোপরি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ই বলা যেতে পারে। সেকালে এ আশ্রম ছিল ঠিক গঙ্গার ধারেই—আজকাল অবশ্য গঙ্গার ধারা প্রায় মাইলখানেক দূরে সরে গেছে। আমাদের বাগানের কোনো কোনো জায়গায় বালির পরিমাণ খুব বেশি—কে জানে হয়তো এই বাগানের ভিতর দিয়েই ছিল প্রাচীন গঙ্গার ধারাপথ।

 এই সময়টা ছিল আর্যদের গৌরবময় যুগে। খুবই দুঃখের বিষয়, এ যুগের ইতিহাস আমরা জানি না, যতটুকু জানি তা অপ্রামাণিক গ্রন্থ থেকে। তখনকার আর্যপ্রদেশ ও রাজত্বগুলির নাম ছিল দক্ষিণ বিহারে মগধ; উত্তর-বিহারে বিদেহ; কাশী অথবা বারাণসী, কোশল, এর রাজধানী ছিল অযোধ্যা—আজকাল যার নাম ফয়জাবাদ; গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী দেশ পাঞ্চাল। পাঞ্চাল দেশের সবচেয়ে বড়ো দুটি শহরের নাম ছিল মথুরা ও কান্যকুব্জ। পরবর্তী কালের ইতিহাসে এই দুটি শহর কম বিখ্যাত ছিল না। দুটি শহরই এখনও পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে, কেবল কান্যকুব্জের নাম বদলে হয়েছে কনৌজ। এই শহরটি কানপুরের কাছে। আর ছিল উজ্জয়িনী; আজকাল উজ্জয়িনী গোয়ালিয়র রাজ্যের একটি সামান্য শহরমাত্র।

 পাটলিপুত্র অথবা পাটনার কাছে ছিল বৈশালী। এই বৈশালী ছিল ইতিহাসপ্রখ্যাত লিচ্ছবিকুলের রাজধানী। বৈশালীতে ছিল সাধারণতন্ত্র, প্রজাদের প্রতিনিধি সংসদ থেকে নির্বাচিত একজন নায়ক দেশ শাসন করতেন।

  1. লেখকের পৈত্রিক বাড়ি