বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪১

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
চীনের সহস্র বৎসর
২৩

 কালক্রমে বড়ো বড়ো শহর গড়ে উঠতে লাগল। ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিল্পেরও যথেষ্ট প্রসার হতে আরম্ভ করল। শহরগুলি হল ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র। তপোবনের শিক্ষাকেন্দ্রগুলির আকার আয়তন ও জনসংখ্যাও ক্রমে ক্রমে বেড়ে উঠতে লাগল। এইসব আশ্রমে থাকতেন আচার্যরা ও তাঁদের শিষ্যসম্প্রদায়; এমন বিষয় ছিল না যা নিয়ে তাঁরা চর্চা না করতেন। যত বিদ্যা সে যুগে জানা ছিল সবই শিক্ষা দেওয়া হত। এমনকি ব্রাহ্মণেরা যুদ্ধবিদ্যা পর্যন্ত শিক্ষা দিতেন। তুমি তো মহাভারতে পাণ্ডবদের গুরু দ্রোণাচার্যের কথা পড়েছ। দ্রোণ ছিলেন ব্রাহ্মণ, তিনি তাঁর ক্ষত্রিয় শিষ্যদের অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবিদ্যাও শিক্ষা দিয়েছিলেন।


১১

চীনের সহস্র বৎসর

১৬ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 কারাপ্রাচীর ভেদ করে বাইরের জগতের খবর এখানেও এসে পৌঁচেছে—সে খবরে একদিকে যেমন মনে দুঃখ পাই অপরদিকে তেমনি গর্বে আনন্দে বুক ভরে ওঠে। শোলাপুরের লাঞ্ছনার কাহিনী আমরা শুনেছি। আবার সে সংবাদ শুনে দেশব্যাপী যে আন্দোলন হয়েছে তারও টুকরাটাকরা খবর আমরা পাচ্ছি। আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিচ্ছে, হাজার হাজার লোক স্ত্রীপুরুষ-নির্বিশেষে বেপরোয়া লাঠির আঘাত সইছে—এসব কথা ভাবলে নিশ্চেষ্ট হয়ে এখানে চুপ করে বসে থাকা কঠিন হয়। কিন্তু এরও প্রয়োজন আছে—এতে আমাদের ভালোই হবে। আমার মনে হয়, প্রত্যেকেরই সেই সুযোগ আসছে যখন সকলকে চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড়াতে হবে। ইতিমধ্যে দেশবাসীর সাহস দেখে মনে খুব আনন্দ পাচ্ছি। এগিয়ে গিয়ে তারা দুঃখকে বরণ করছে। শত্রু যত আঘাত করছে এদের শক্তি তত বাড়ছে, দ্বিগুণ উৎসাহে শত্রুকে প্রতিরোধ করছে।

 প্রতিদিনের খবর এসে মনকে এত দোলা দিচ্ছে যে অন্য কোনো কথা ভাবা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু মিথ্যে ভেবে ভেবে কিচ্ছু লাভ হয় না। সত্যিকারের কাজ করতে হলে মনকে সংযত করতে হবে। কাজেই এসব দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়ে মনটাকে বরং খানিকক্ষণের জন্য চালান দেওয়া যাক পুরাকালের জগতে।

 যাওয়া যাক এক্কেবারে চীন দেশে। প্রাচীনকালের ইতিহাসে ভারতবর্ষ আর চীন দেশ যেন দুই ভগিনী। চীন এবং পূর্ব-এশিয়ার অন্যান্য দেশ—এই যেমন জাপান, কোরিয়া, ইন্দোচীন, শ্যাম এবং ব্রহ্মদেশ—আর্যদের বাসস্থান নয়। ওসব দেশে মঙ্গোলীয় জাতির বাস।

 প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে কিংবা তারও আগে এক দল লোক চীন দেশ আক্রমণ করেছিল। এরা এসেছিল মধ্য-এশিয়া থেকে। সভ্যতার দিক থেকে এরা অনেক বেশি অগ্রসর ছিল। এরা কৃষিবিদ্যা জানত এবং গোপালন-মেষ পালনেও অভ্যস্ত ছিল। এরা তখন চমৎকার বাড়িঘর তৈরি করতে শিখেছে, এদের সমাজব্যবস্থাটিও ছিল সুশৃঙ্খল। প্রথমটায় এসে এরা হোয়াংহো বা পীত নদীর ধারে বসবাস শুরু করল, আস্তে আস্তে সেখানে একটি ছোটো রাষ্ট্র গড়ে উঠল। তার পরে কয়েক শো বছর ধরে ওরা ক্রমে চীন দেশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ইতিমধ্যে তাদের শিল্পকলারও অনেক উন্নতি হয়েছে। চীন দেশের লোকেরা প্রধানত ছিল কৃষিজীবী। আর তাদের মধ্যে যারা ছিল দলের মোড়ল তারা অনেকটা সেই প্যাট্রিয়ার্ক বা সমাজপতিদের মতো, যাদের কথা আমি আগের কয়েকটি চিঠিতে তোমাকে বলেছি। এর ছ-সাত শো বছর পরে অর্থাৎ এখন থেকে চার হাজার বছরেরও আগে ইয়াও বলে একজন লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়—ইনি নিজেকে সম্রাট বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু মস্ত বড়ো নাম নিলে কী হবে, আসলে তিনি ছিলেন সেই সমাজপতিরই শামিল। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয়ার সম্রাট বলতে আমরা যা দেখেছি ইনি তার