বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
চীনের সহস্র বৎসর
২৫

কিছুই ছিলেন না। চীন দেশের লোকেরা প্রধানত কৃষিকাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত, কাজেই বহুকাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো শাসনপ্রণালী ও দেশে গড়ে ওঠে নি।

 গোড়ার দিকে লোকেরা নিজেদের মধ্যে একজনকে সমাজপতি নির্বাচিত করে নিত, কিন্তু ক্রমে সমাজপতির পদ হয়ে গেল বংশানুক্রমিক, অর্থাৎ পিতা থেকে পুত্রে বর্তাতে লাগল। চীন দেশেও তাই ঘটেছিল। অবশ্য ইয়াও-এর মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলে তাঁর স্থলাভিষিত হয় নি। দেশের মধ্যে যাকে তিনি যোগ্যতম বাক্তি মনে করেছিলেন তাকেই সম্রাট পদে মনোনীত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু অল্পকালমধ্যেই রাজপদ বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠে এবং গোড়ার দিকে চার শো বছরেরও বেশি কাল কোন্-এক সিয়া-বংশ চীন দেশে রাজত্ব করে। এ বংশের সর্বশেষ রাজা ছিলেন খুব অত্যাচারী। তার ফলে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে তাঁকে রাজ্যচ্যুত করে। এর পরে শাঙ বা ঈন্ নামে আর-একটি বংশ রাজ্যভার গ্রহণ করে। এদের রাজত্ব চলেছিল প্রায় সাড়ে ছশো বছর।

 দু-চার কথায় এবং অল্প কটি ছত্রের মধ্যেই আমি চীন দেশের সহস্রাধিক বৎসরের ইতিহাস শেষ করে দিয়েছি। খুব অদ্ভুত লাগছে, না? ইতিহাসের মধ্যে যে বিশাল কালের বিস্তার তাতে এ ছাড়া আর উপায় কী? কিন্তু এ কথা মনে রাখবে যে ইতিহাসটা যতই সংক্ষেপে বলি না কেন, কালের দৈর্ঘ্যটাকে তাই বলে ছেঁটে সংক্ষেপ করি নি; সেটা হাজার বা এগারো শো বছরই আছে। আমাদের কাছে সময়ের পরিমাপ হচ্ছে দিন মাস বছর দিয়ে। কাজেই বেশির কথা ছেড়ে দাও, বোধকরি এক শো বছর সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা করাই তোমার পক্ষে কঠিন। এই-যে তোমার মাত্র তেরো বছর বয়স হয়েছে তা-ই তোমার কাছে রীতিমতো সুদীর্ঘকাল বলে মনে হয়, তাই না? তা ছাড়া, এক-একটি বছর যায় আর তুমি মাথায় কতখানি বড়ো হয়ে ওঠো! তা হলেই দেখো, এমনিতরো ইতিহাসের, হাজারটা বছরের কথা কল্পনা করা কি সহজ ব্যাপার? এ যে দীর্ঘাতিদীর্ঘ কাল! যুগের পর যুগ আসছে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র শহর মহানগরী হয়ে উঠছে আবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, ঠিক সেই স্থানেই আবার নূতন শহরের পত্তন হচ্ছে। কেবল গত হাজার বছরের ইতিহাসের কথাই ভেবে দেখো-না, তা হলেই কালের দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে তোমার একটু ধারণা হবে। গত হাজার বছরে পৃথিবীতে যে পরিবর্তন হয়েছে, ভাবতে গেলে সত্যি অবাক হতে হয়।

 এই চীন দেশের ইতিহাস বাস্তবিকই বিস্ময়কর। কত প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃতির ধারা বহন করে চলেছে এই ইতিহাস, আর কত রাজবংশের ইতিবৃত্ত—তার কোনোটি চলেছে পাঁচ শো বছর ধরে, কোনোটি বা আট শো বছরেরও বেশি।

 আমি অতি সংক্ষেপে যে এগারো শো বছরের ইতিহাস বলেছি, মনে রাখবে সে সময়টাতে চীন দেশের সভ্যতার বিকাশ হয়েছে অতিশয় ধীর গতিতে। ক্রমে ক্রমে সমাজপতির শাসন গেল উঠে, দেখা দিল কেন্দ্রীয় শাসন, সৃষ্টি হল সুনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের। সেই অতিপ্রাচীন কালেই কিন্তু চীন দেশের লোকেরা লিখনপ্রণালী জানত। কিন্তু তুমি নিশ্চয় জানো, আমাদের ভাষায় কিংবা ইংরেজি বা ফরাসি ভাষায় যে লিখনপ্রণালী—চীনা ভাষার লিখনপ্রণালী তার থেকে স্বতন্ত্র। ও ভাষায় কোনো অক্ষরমালা নেই। ওরা লেখে ছবি কিংবা সাংকেতিক চিহ্নের সাহায্যে।

 ছ শো চল্লিশ বছর রাজত্ব করবার পর প্রজারা বিদ্রোহ করে শাঙ-বংশকে সিংহাসনচ্যুত করে। এবারে যাঁরা ক্ষমতা লাভ করলেন তাঁরা চাউ-বংশ বলে খ্যাত। শাঙ-বংশের চাইতে এরা আরও দীর্ঘকাল রাজত্ব করেছিলেন। এই চাউদের রাজত্বকালেই সুনিয়ন্ত্রিত চীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। কন্‌ফুসিয়স এবং লাওসে নামে বিখ্যাত জ্ঞানী দার্শনিকদের আবির্ভাবও এই সময়েই হয়েছিল। পরে এদের কথা আরও বলব।

 শাঙ-রাজারা যখন বিতাড়িত হলেন তখন কিৎসি-নামক এ’দের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী চাউ-রাজাদের বশ্যতা স্বীকার না করে বরং দেশত্যাগী হওয়াই শ্রেয় মনে করলেন। পাঁচ হাজার অনুচর সঙ্গে করে তিনি চীন দেশ ছেড়ে কোরিয়া দেশে চলে গেলেন। তিনি গিয়ে দেশের নামকরণ করলেন ‘চো-শেন’ বা প্রভাত-শান্তির দেশ। কোরিয়া বা চো-শেন চীন দেশের পূর্বদিকে অবস্থিত, এই ভেবেই কিৎসি পূর্বাচলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বোধহয় ভেবেছিলেন এর পূর্ব-