বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
অতীতের আহ্বান
২৭

প্রজাতান্ত্রিক ভিত্তি, গ্রাম থেকে কালক্রমে শহর ও রাষ্ট্রের উদ্ভব, তপোবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণতি—এইসব ঘটনার কথাও তোমাকে বলেছি। খুব অল্পের মধ্যে যদিও, তবু তোমাকে পারশ্য ও মেসোপটেমিয়ার বহু সাম্রাজ্যের উত্থানপতনের কথা এবং দারিয়ুস নামে পারশ্যের একজন রাজার সিন্ধুনদ অবধি রাজ্যবিস্তারের কথা বলেছি। প্যালেস্টাইনের কথা বলতে গিয়ে ইহুদিদের কথা এবং কেমন করে ছোট্ট একটি দেশের মুষ্টিমেয় লোক সারা জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—এ সবই তোমাকে জানিয়েছি। এই ইহুদিদের ডেভিড ও সলোমন নামে দুজন রাজার নাম বাইবেল গ্রন্থে আছে, ফলে তাঁরা এখনও স্মরণীয় হয়ে আছেন—যদিও তাঁদের চাইতে বড়ো বড়ো রাজার কথা লোকে ভুলে গেছে। নোসসের ধ্বংসস্তূপে নূতন আর্যসভ্যতার বনিয়াদ গঠন, গ্রীসের নগর-রাষ্ট্র, ভূমধ্যসাগরের ধারে ধারে গ্রীসের উপনিবেশ স্থাপন, রোমের ভাবী গৌরবের সূচনা, ইতিহাসের প্রাঙ্গণে রোমের প্রতিদ্বন্দীস্বরূপ কার্থেজ নগরের পদার্পণ—কোনো কথাই বাদ দিই নি।

 কিন্তু এ দেখা নিতান্তই উপর-উপর দেখা। এ ছাড়া আমি অন্য অন্য দেশের কথাও হয়তো বলতে পারতাম—এই যেমন উত্তর-ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার কয়েকটা দেশ। সেই প্রাচীন যুগেও দক্ষিণ ভারতের নাবিকেরা বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে মালয় প্রভৃতি দেশে গিয়েছিল। কত কথাই তো বলা যায়, কিন্তু সব কথা বলতে গেলে আর এগোনো যাবে না।

 ইতিপূর্বে যেসব দেশের কথা বলেছি সেগুলি সবই বহু প্রাচীন। সেই সুদূর অতীতে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের যোগাযোগ ছিল খুবই কম; পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বেশি হলে তো কথাই নেই। যারা একটু দুঃসাহসী তারা সাগর পার হয়ে বিদেশে যেত, আবার কেউ কেউ দেশদেশান্তর অতিক্রম করে চলে যেত ব্যবসাবাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। এটা অবশ্য কালেভদ্রেই ঘটত, কারণ বিদেশে বিভুঁয়ে যাবার বিপদ ছিল ঢের। বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক সংস্থান সম্বন্ধে লোকের ধারণা খুব পরিষ্কার ছিল না। লোকের বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবী একটা বিস্তীর্ণ সমতলভূমি—পৃথিবী যে গোল সে কথা আবিষ্কৃত হয় অনেককাল পরে। গ্রীসের লোকেরা চীন বা ভারত সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানত না, তেমনি আবার চীন ও ভারতের লোকেরাও ভূমধ্যসাগরের দেশগুলি সম্বন্ধে একপ্রকার অজ্ঞই ছিল।

 প্রাচীন কালের পৃথিবীর একটি মানচিত্র যদি সংগ্রহ করতে পারো তো খুব ভালো হয়। সে সময়কার পৃথিবী ও দেশবিদেশের বিবরণ প্রাচীন লেখকরা কিছু কিছু লিখে গেছেন। এইসব লেখায় বিভিন্ন দেশের আকার ও আয়তন সম্বন্ধে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথা আছে। অতীতের পৃথিবীর যেসব মানচিত্র আজকাল তৈরি হয়, সেগুলি অতীতের ইতিহাস বোঝার পক্ষে খুবই দরকারি। হাতের কাছে এরকম মানচিত্র রাখা উচিত। মানচিত্র ছাড়া ইতিহাস বোঝা একপ্রকার অসম্ভব বললেই হয়। কেবল মানচিত্র কেন, পুরাতন কালের ঘরবাড়ি ভগ্নাবশেষ প্রভৃতির ছবি যা পাওয়া যায় সব-কিছুই ইতিহাস বোঝার পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন। এই ছবিগুলিই এক হিসাবে ইতিহাসের জীর্ণ কঙ্কালকে রূপায়িত জীবন্ত করে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে। ইতিহাস থেকে সত্যকার শিক্ষা পেতে হলে অতীতের ঘটনাপ্রবাহকে দেখতে হবে চলচ্চিত্রের ছবির মতো—যেন মনে হবে সব চোখের উপর ভাসছে। ইতিহাস যেন একটা রোমাঞ্চকর অভিনয়ের মতো। এ অভিনয় একবার দেখতে বসলে চোখ ফেরানো যায় না। কখনও মিলনান্ত কখনও-বা বিয়োগান্ত নাটক অভিনীত হচ্ছে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে। যাঁরা অভিনয় করছেন তাঁরা হলেন প্রাচীন কালের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ পুরুষ ও নারী।

 ছবি ও মানচিত্র দেখলে ইতিহাসের ঘটনাবলীর শোভাযাত্রা সবন্ধে আমাদের খানিকটা চোখ খুলে যায়। প্রত্যেক ছেলেমেয়ের হাতে এগুলি দেওয়া উচিত। এর চেয়ে অনেক ভালো হয় যদি তারা চক্ষে অতীতের ধ্বংসাবশেষগুলি দেখে আসতে পারে। সব-কিছু দেখা সম্ভব নয়, কারণ এগুলি ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু একটু নজর দিলে আমাদের নাগালের মধ্যেই কিছু কিছু দেখতে পাওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া বড়ো বড়ো যাদুঘরেও এই ধরনের জিনিষ কিছু কিছু সংগ্রহ করে রাখা থাকে। অতীতের সাক্ষ্যস্বরপ অনেক ধ্বংসাবশেষ ভারতে দেখা যায়। খুব প্রাচীন কালের নিদর্শন অবশ্য মোহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা ছাড়া অন্য কোনো জায়গায়