বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২৮
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। এমনও হতে পারে যে এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশের প্রচণ্ড তাপের ফলে অনেক কিছুই শুকিয়ে গুঁড়ো হয়ে ধুলো হয়ে গেছে। এ ধারণাটা কেবল আংশিকভাবে সত্য। প্রাচীন কালের চিহ্নস্বরূপ অনেক-কিছু জিনিষ এখনও মাটির তলায় আত্মগোপন করে আছে; সেগুলি আজ পর্যন্ত খুঁড়ে বার করা হয় নি। এইসব ধ্বংসাবশেষ অনুশাসন ইত্যাদি খুঁড়ে বার করা হলে পর দেখবে আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাসের বই যেন পাতার পর পাতা খুলে যাচ্ছে। ইঁটপাথরের পাতায় দেখতে পাবে আমাদের পূর্বাপুরুষদের কীর্তিকাহিনী।

 তুমি তো দিল্লি শহরের আশেপাশে কিছু কিছু পুরোনো ঘরবাড়ি প্রভৃতির ধ্বংসাবশেষ দেখেছ। আবার যখন দিল্লি গিয়ে এগুলি দেখবে তখন বিগত দিনের কথা ভেবে দেখো—মনে হবে যেন সেই প্রাচীন কালে ফিরে গেছে। এই ধ্বংসাবশেষগুলি যে-কোনো ইতিহাসের বইয়ের চাইতে অনেক বেশি শিক্ষা দিতে পারে। সেই মহাভারতের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দিল্লি শহরে বা তার আশেপাশে কত মানুষ বসবাস করে এসেছে। কত লোক কত নামে ডেকেছে এই শহরকে: ইন্দ্রপ্রস্থ, হস্তিনাপুর, তুঘ্‌লকাবাদ, শাজাহানাবাদ এবং আরও কত নামে। শোনা যায়, যমুনা নদীর ধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সাত-সাতটা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এই একই দিল্লি শহর পত্তন করা হয়। আজ যে নূতন দিল্লি বা রায়সিনা শহর দেশের বর্তমান শাসনকর্তাদের হুকুমে নির্মিত হয়েছে, এক হিসাবে তাকে অষ্টম দিল্লি বলা চলে। কত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এই দিল্লি শহর, কত সাম্রাজ্যের উত্থানপতন ঘটেছে এই দিল্লিতে!

 এ দেশের প্রাচীনতম শহর বারাণসী বা কাশীতে গিয়ে একবার তার অস্ফুট কথাগুলি কান পেতে শুনো দেখি। কাশী তোমাকে স্মরণাতীত কালের খবর দেবে। বলবে, তার চোখের সামনে কত সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, তবু সে টিঁকে আছে। বলবে, বুদ্ধ এসেছিলেন বারাণসীতে তাঁর নূতন ধর্মের বাণী নিয়ে। আর বলবে লক্ষ লক্ষ লোকের কথা—যারা যুগে যুগে পুণ্যধামে এসেছে শান্তি ও সান্ত্বনার আশায়। পলিতকেশা, ন্যুব্জদেহা জীর্ণচীরপরিহিতা বৃদ্ধা এই কাশী—যুগযুগান্তের সঞ্চিত শক্তিতে এখনও শক্তিমতী এই প্রাচীনা নগরী। এখনও মানুষের মনোহরণ করে এই আশ্চর্য কাশী, তার চোখে যেন প্রাচীন ভারত জ্বল্‌জ্বল্ করে, তার গঙ্গার কলধ্বনি যেন অতীতের বিস্মৃত কণ্ঠের সংগীত যুগ যুগ বহন করে নিয়ে চলেছে।

 অত দূরে নাই-বা গেলে, আমাদের এলাহাবাদ অথবা প্রয়াগ নগরীর অশোকস্তম্ভের উপর যে অনুশাসন খোদাই করা আছে তার সামনে একটিবার দাঁড়াও—মনে হবে যেন দু হাজার বছরের ব্যবধান থেকে প্রিয়দর্শীর কণ্ঠ ভেসে আসছে।


১৩

ধনসম্পদ যায় কোথায়?

১৮ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 মুসৌরিতে তোমাকে যেসব চিঠি লিখেছি তাতে মানুষের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে নানাবিধ শ্রেণীর উদ্ভব হল তাই দেখাবার চেষ্টা করেছি। আদিম কালের মানুষকে বড়ো কঠোর জীবন যাপন করতে হত। কেবলমাত্র খাদ্যসংগ্রহ নিয়েই তার দুশ্চিতার অবধি ছিল না। বনে বনে শিকার করে বেড়াতে হত, প্রতিদিনের খাদ্যের জন্য ফলমূল সংগ্রহ করতে হত। কখনও কখনও খাদ্যের অন্বেষণে স্থান থেকে স্থানান্তরে যেতে হত। এইভাবে ক্রমে ক্রমে দল গড়ে উঠতে লাগল। এই দলগুলো আর কিছু নয়, কতকগুলো বৃহৎ পরিবারের সমষ্টিমাত্র। তারা একসঙ্গে বাস করত, একসঙ্গে শিকার করত, কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে একা থাকার চাইতে দল বেঁধে থাকা বেশি নিরাপদ। তার পরে একটা বিরাট পরিবর্তন এল—এটি হল কৃষিবিদ্যা-আবিষ্কারের