সঙ্গে সঙ্গে; এতে এক ঘোরতর পরিবর্তন হল। লোকে দেখল, সারাক্ষণ শিকার করে বেড়ানোর চাইতে কৃষিবিদ্যার সাহায্যে জমি থেকে খাদ্যসংগ্রহ করা অনেক বেশি সহজ। আর জমি চাষ করা, বীজ বপন করা, ফসল কেটে আনা—এতসব কাজে ব্যাপৃত থাকলে জমিটাকেই সম্বল করে বাস করতে হয়। এতদিন যে তারা চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াত এখন আর তা সম্ভব হল না। কাজেই জমির কাছাকাছি স্থায়ী আস্তানা করতে হল। এরই ফলে আস্তে আস্তে গ্রাম শহর গড়ে উঠতে লাগল।
কৃষিবিদ্যার ফলে আরও-সব পরিবর্তন হয়েছে। জমি থেকে যে খাদ্য সংগ্রহ হত তা অনেক সময়েই তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে পড়ত; এই বাড়তি ফসল তারা মজুত করে রাখত। সেই পুরোনো দিনে যখন তারা শিকার করে খেত, তার চাইতে এখন জীবনের জটিলতা একটু বেড়ে গেল। বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগ হয়ে এক দল লোক জমিতে চাষের কাজ করতে লাগল, এক দল রক্ষণাবেক্ষণের, আর এক দল সাধারণ শৃঙ্খলা বিধানের। এই পরিচালক এবং শৃঙ্খলা-বিধানকারীর দলই ক্রমে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠল। পরে তারাই হল সমাজপতি কিংবা শাসনকর্তা, রাজা কিংবা অভিজাতসম্প্রদায়। হাতে ক্ষমতা পেয়ে খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশের বেশির ভাগ এরাই গ্রাস করতে লাগল। কাজেই এরা হয়ে উঠল অপরের চেয়ে ধনী; আর যারা জমিতে খেটে ফসল ফলাত তাদের ভাগে যেটুকু আসত তাতে কোনোরকমে তাদের উদরপূর্তি হত মাত্র। ক্রমে ক্রমে অবস্থা হল, পরিচালকের দল এত অলস এবং অকর্মণ্য হয়ে পড়ল যে, তাদের দ্বারা পরিচালনার কাজও আর ভালো করে চলত না। তারা কিছুই করত না, কিন্তু ভাগ নেবার বেলায় সবচেয়ে বড়ো ভাগটি তাদের নেওয়া চাই। তাদের এখন এই ধারণা জন্মে গেল যে অপরে যা পরিশ্রম করে উৎপাদন করবে তাই বসে বসে খাবার জন্মগত অধিকার তাদের আছে।
তা হলেই দেখতে পাচ্ছ, কৃষিবিদ্যা-আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে কী বিরাট পরিবর্তন এসে গেল। খাদ্যসংগ্রহের উন্নততর প্রণালী উদ্ভাবন করে, খাদ্য সহজলভ্য করে দিয়ে, কৃষিবিদ্যা বলতে গেলে সমাজের ভিত্তি একেবারে নেড়েচেড়ে দিল। লোকের হাতে এখন প্রচুর অবসর। বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্ভব হল; প্রত্যেক ব্যক্তিকে এখন আর খাদ্যসংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হয় না, কাজেই কতক লোক অন্য কাজ বেছে নিল। নানান রকমের শিল্প, নূতন নূতন ব্যবসা দেখা দিল। কিন্তু ক্ষমতা থেকে গেল সেই পরিচালকশ্রেণীর হাতেই।
পরবর্তী ইতিহাস থেকে তুমি দেখতে পাবে, খাদ্য এবং অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদনের নূতন নূতন প্রণালী উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে কীভাবে বড়ো বড়ো পরিবর্তন এসেছে। সভ্যতার গতির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ছাড়া আরও অনেক জিনিষের প্রয়োজন মানুষ বোধ করতে লাগল। কাজেই উৎপাদনপ্রণালীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজেও পরিবর্তন এল। একটা বেশ বড়োরকমের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এই ধরো, যখন রেল স্টীমার কারখানা সব বাষ্পে চালিত হতে লাগল তখন কাজেকাজেই আমাদের উৎপাদন এবং বণ্টন প্রণালীতে বিরাট পরিবর্তন দেখা দিল। সাধারণ শিল্পব্যবসায়ীরা তাদের নিজ হাতে এবং ছোটো ছোটো হাতিয়ারের সাহায্যে যেসব জিনিষ তৈরি করত তাই এখন অনেক বেশি দ্রুতবেগে উৎপন্ন হতে লাগল বাষ্পচালিত কারখানায়। বড়ো বড়ো কলগুলো তো আর কিছু নয়, খুব বিরাট আকারের হাতিয়ার মাত্র। এখন থেকে খাদ্যদ্রব্য এবং কারখানায়-উৎপন্ন অন্যান্য জিনিষ রেলে স্টীমারে করে দ্রুতবেগে দেশে দেশান্তরে প্রেরিত হতে লাগল। এর ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে কত বড়ো পরিবর্তন এল তা তুমি সহজেই বুঝতে পারছ।
ইতিহাসে দেখা যায় কিছুকাল পরে পরেই নূতন নূতন এবং দ্রুততর উৎপাদনপ্রণালী আবিষ্কৃত হয়েছে। তুমি নিশ্চয় ভাবছ উৎপাদনপ্রণালী যত উন্নত হবে উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণও তত বাড়বে, পৃথিবীর সম্পদও ক্রমে বাড়তে থাকবে এবং বণ্টনের বেলায় প্রত্যেকের ভাগেই কিছু বেশি পড়বে। আমি কিন্তু বলব তোমার কথা খানিকটা সত্য হলেও পুরোপরি সত্য নয়। উৎপাদনপ্রণালীর উন্নতির ফলে পৃথিবীর সম্পদ অনেক বেড়েছে, এ কথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু বেড়েছে কোন খানটায়? স্পষ্টই তো দেখতে পাচ্ছি, আমাদের দেশে এখনও দুঃখদৈন্যের অন্ত নেই। আর কেবল কি আমাদের দেশে? ইংলণ্ডের মতো ধনী দেশেও ঐ অবস্থা। কেন এমন হয়? এত ধনসম্পদ তা হলে কোথায় যায়? এটা বড়ো আশ্চর্যের বিষয় যে ক্রমেই পৃথিবীর ধনোৎপাদন বাড়ছে,