বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৩০
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

কিন্তু তা সত্ত্বেও গরিবেরা সেই গরিবই থেকে যাচ্ছে। কোনো কোনো দেশে অবস্থার যৎকিঞ্চিৎ পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু যে পরিমাণে ধনোৎপাদন হচ্ছে, তার তুলনায় সেটা কিছুই নয়। এইসব ধনসম্পদ কোথায় যাচ্ছে সেটা আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি। ঐ-যে সব কর্মকর্তা আর পরিচালকের দল রয়েছেন, তাঁরা এমন ব্যবস্থা করেছেন যাতে সব ভালো জিনিষের মোটা অংশটা তাঁদেরই হাতে এসে পড়ে। আরও আশ্চর্য, সমাজে এমনসব শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, যারা ভুলেও কোনো কাজ করে না; অথচ অপরের পরিশ্রমলব্ধ লাভের বারো আনা অংশ তারাই বাগিয়ে নেয়। আর বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, এরাই সমাজে সম্মানের পাত্র হয়ে বসেছে। আবার এমন মূর্খও আছে যারা ভাবে, খেটে খেতে গেলে সম্মান বুঝি থাকে না। পৃথিবী জুড়ে এমনি বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় যে চাষীর দল জমিতে খেটে খাদ্য উৎপাদন করছে এবং যে শ্রমিক কারখানায় খেটে ধনোৎপাদন করছে, তারা যে দরিদ্রই থেকে যাবে, এ আর বিচিত্র কী? আমরা তো দেশের স্বাধীনতার কথা বলছি, কিন্তু সমাজের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা যদি দূর না হয়, শ্রমিক যদি তার পরিশ্রমের পুরস্কার না পায় তবে সেই স্বাধীনতা দিয়ে আমাদের কী হবে? রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং ধনবণ্টন-সমস্যা নিয়ে কতসব মোটা মোটা বই লেখা হচ্ছে। বড়ো বড়ো পণ্ডিত অধ্যাপকের দল এইসব বিষয়ে বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু কেবল কথা আর আলোচনাই চলছে; ওদিকে যে লোকটা খাটছে তার তো দুঃখের অন্ত নেই। দুশো বছর আগে প্রসিদ্ধ ফরাসি পণ্ডিত ভল্‌টেয়ার এইসব রাজনীতিজ্ঞের দল সম্বন্ধে বলেছিলেন, “যে চাষী খাদ্য উৎপাদন করে অপরের প্রাণরক্ষা করছে, তাকে অনাহারে বধ করাই হচ্ছে এদের দস্তুর।”

 যাক সে কথা। আদিম মানুষ ক্রমে উন্নত হয়ে ধীরে ধীরে বন্যপ্রকৃতির উপর আপন প্রাধান্য বিস্তার করেছে। বনজঙ্গল সাফ করেছে, বাড়িঘর তৈরি করেছে এবং জমি চাষ করেছে। লোকে বলে, মানুষ নাকি প্রকৃতিকে জয় করেছে। এটা একটা ধোঁয়াটে রকমের কথা, পুরোপরি সত্য বলে একে গ্রহণ করা যায় না। এর চেয়ে বরং বলা ভালো যে, মানুষ প্রকৃতিকে বুঝতে শুরু করেছে এবং বোঝার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির সহযোগিতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, প্রকৃতিকে আপনার প্রয়োজনে নিয়োজিত করছে। প্রাচীনকালে মানুষ প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে ভয়ের চোখে দেখেছে। বোঝবার চেষ্টা না করে পুজো দিয়ে, বলির আয়োজন করে প্রকৃতিদেবীকে প্রসন্ন করবার চেষ্টা করেছে। তাদের কাছে প্রকৃতি ছিল যেন একটা হিংস্র জন্তু; তাকে খোশামোদ করে, খুশি করে শান্ত রাখতে হয়। বজ্রপাত, বিদ্যুৎচমক, মহামারী সবতাতেই তাদের ভয় ছিল, আর তারা ভাবত উপযুক্ত বলি না পেলে এরা কিছুতেই নিবৃত্ত হবে না। অনেক সরলপ্রাণ লোকের ধারণা, সূর্যগ্রহণ-চন্দ্রগ্রহণও একটা ভয়ংকর রকমের দুর্ঘটনা। এটা যে একটা অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক ঘটনা সে কথা বোঝবার চেষ্টা না করে লোকে মিছিমিছি দুশ্চিন্তায় অধীর হয় এবং ব্যস্তসমস্ত হয়ে চন্দ্র-সূর্যকে রক্ষা করবার জন্য উপোস করে কিংবা গঙ্গাস্নান করে। চন্দ্র-সূর্য নিজেরাই নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে; তাদের নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার কিচ্ছু দরকার নেই।

 সভ্যতা এবং সংস্কৃতির অগ্রগতির কথা আমরা বলেছি এবং এও দেখেছি, এর শুরু হয়েছিল যখন থেকে মানুষ শহরে এবং গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেছে। খাদ্যের যে উদ্বৃত্ত অংশ জমা থাকত তার ফলে মানুষের খানিকটা অবকাশ মিলল; এখন তারা শিকার এবং আহার অন্বেষণ ছাড়া অন্য জিনিষের কথা ভাববার সময় পেল। চিন্তাশক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিল্প, ব্যবসা এবং সংস্কৃতিরও উন্নতি হতে লাগল। ওদিকে লোকসংখ্যাও বাড়ছে, তার ফলে অনেক লোককে একসঙ্গে কাছাকাছি থাকতে হত। তাতে একে-অন্যের সঙ্গে মেলামেশা বাড়ল এবং নানান ব্যাপারে মানুষে মানুষে আদানপ্রদান চলল। অনেক লোক একসঙ্গে বাস করতে হলে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সম্বন্ধে একটু বিবেচনা না করলে চলে না। এমন কাজ করা চলবে না, যাতে সঙ্গী কিংবা প্রতিবেশীর অসুবিধা হতে পারে। এ না হলে সামাজিক জীবন কিছতেই গড়ে উঠতে পারে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি পরিবারের কথাই ধরো-না—একটি পরিবারই তো বলতে গেলে একটি ছোটোখাটো সমাজ। পরিবারস্থ প্রত্যেকটি ব্যক্তি যদি অপরের সম্বন্ধে একটু বিবেচনা না করে তা হলে সে পরিবার তো কিছুতেই সুখী হতে পারে না। এটি এমন কিছু শক্ত ব্যাপারও নয়,