বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৪৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ও ধর্ম
৩১

কারণ পরিবারস্থ সকল ব্যক্তির মধ্যে এমনিতেই একটি ভালোবাসার সম্পর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু দেখা যায়, আমরা ঐ সামান্য বিবেচনাটকু করতে ভুলে যাই। তাতে শুধু প্রমাণ হয় যে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে সভ্য এবং মার্জিত নই। পরিবারের চেয়ে বৃহত্তর গোষ্ঠী সম্বন্ধেও ঠিক ঐ কথাই ঘাটে—সেটা আমাদের প্রতিবেশী কিংবা এক-নগরের অধিবাসী, দেশবাসী অথবা বিদেশী—এদের যার সম্বন্ধেই হোক। সুতরাং লোকসংখ্যা-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবনে অনেক উন্নতি হয়েছে। অপরের জন্য বিবেচনাবোধ এবং আত্মসংযম অনেক বেড়েছে। সংস্কৃতি, সভ্যতা, এসব কথার যথার্থ সংজ্ঞা দেওয়া বড়োই কঠিন। আমি তা দেবার চেষ্টাও করছি না। তবে সংস্কৃতি বলতে আমরা যেসব গুণের সমাবেশ মনে করি তার মধ্যে আত্মসংযম এবং অপরের মঙ্গলচিন্তা—এই দুটি গুণ নিশ্চয়ই প্রধান। যে ব্যক্তির মধ্যে এই আত্মসংযম এবং অপরের প্রতি বিবেচনাবোধের অভাব আছে, তাকে মার্জিত এবং সভ্য নিশ্চয়ই বলা চলে না।


১৪

খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ও ধর্ম

২০শে জানুয়ারি, ১৯৩১

 ইতিহাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চলো আমরা এগিয়ে যাই। দু হাজার পাঁচ শো বছর অর্থাৎ খৃষ্টের জন্মের প্রায় ছশো বছর আগেকার একটা জায়গায় এসে আমরা থেমেছি। তারিখটা একেবারে যে নির্ভুল তা নয়। আন্দাজে মোটামুটি একটা সময় নির্দেশ করেছি মাত্র। এইরকম একটা সময়ে কয়েকজন নামকরা লোক, কেউ-বা তাঁদের মধ্যে জ্ঞানী, কেউ-বা ধর্ম প্রবর্তক, বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কেউ চীনে, কেউ ভারতবর্ষে, কেউ পারশ্যে, কেউ-বা গ্রীসে। তাঁরা ঠিক যে সমসাময়িক সে কথা বলা চলে না। অল্প কয়েক বৎসর আগে-পরে আবির্ভূত হয়ে এঁরা খৃষ্টপূর্ব ছয় শতককে বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন। একটা নূতন চিন্তার ধারা, বর্তমান সম্বন্ধে একটা অসন্তোষের ভাব, অনাগত কালের জন্য একটা আশাআকাঙ্ক্ষা যেন সমস্ত পৃথিবীময় একই সময়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটা কথা মনে রেখো, বড়ো বড়ো ধর্মপ্রবর্তক যাঁরা তাঁরা সবাই চেয়েছেন মানবসাধারণের মঙ্গল হয় যাতে, যাতে তারা উন্নত হয় এবং তাদের দুঃখকষ্টের লাঘব ঘটে। বর্তমানের অন্যায় ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে তাঁরা নির্ভয়ে বিদ্রোহ করেছেন। যেখানে পুরাতন সংস্কার মানুষকে অধর্মের পথে নিয়ে গেছে, মানুষের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেইখানেই তাঁরা তাকে নির্মমভাবে আঘাত করেছেন। তাকে দূর করার জন্য নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখের সামনে তাঁরা তুলে ধরেছেন মহান জীবনের আদর্শ—যুগে যুগে মানুষ এই আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে, প্রেরণা লাভ করেছে।

 সেই খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতবর্ষে জন্মেছিলেন বৃদ্ধ ও মহাবীর; চীনে কন্‌ফুসিয়স ও লাওৎসে; পারশ্যে জরথুস্ট্র বা জোরোআস্টার;[] এবং গ্রীসের সামোস দ্বীপে জন্মেছিলেন পাইথাগোরাস্। ইতিহাস ছাড়াও অন্য প্রসঙ্গে তুমি হয়তো এঁদের নাম শুনে থাকবে। সচরাচর স্কুলের ছেলেমেয়েদের ধারণা যে পাইথাগোরাস্ লোকটার খেয়েদেয়ে কাজ ছিল না, তাই জ্যামিতির যেন কী একটা সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছিলেন। সেটা আবার বেচারাদের মুখস্থ করতে হয়। সমকোণ বিশিষ্ট ত্রিভুজের তিন বাহুর উপর অঙ্কিত তিনটি চতুর্ভুজ নিয়ে এই সিদ্ধান্তের কারবার। ইউক্লিডের বা অন্য যে-কোনো জ্যামিতির বইয়ে এই সিদ্ধান্তের উল্লেখ আছে। জ্যামিতিক আবিষ্কার ছাড়াও চিন্তাশীল দার্শনিক হিসাবে পাইথাগোরাসের খুবই নাম আছে। ওঁর সম্বন্ধে আমরা খুব


  1. জরথুস্ট্র সম্ভবত খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতকে বর্তমান ছিলেন।