বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৫০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৩২
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

অল্পই জানি, এমনকি কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন পাইথাগোরাস্ নামে কেউ ছিলেন কি না।

 পারশ্যের জোরোআস্টারকে জরথুস্ট্রবাদ নামে একটি ধর্মের গুরু বলা হয়। তাঁকে ঠিক নবধর্মপ্রবর্তক বলা চলে কি না জানি না। খুব সম্ভব পারশ্যের পুরাতন ধর্মমতকে একটা নূতন রূপ দিয়ে তিনি নূতন পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ বহুদিন অতীত হল পারশ্য থেকে এই ধর্ম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেক দিন আগে ও দেশ থেকে এক দল লোক এসেছিল ভারতবর্ষে, আমরা তাদের পার্শি বলি। এই পার্শি সম্প্রদায় এখনও জরথুস্ট্রের ধর্ম অনুসারে অগ্নির উপাসনা করে।

 আগেই বলেছি, এই একই সময়ে চীন দেশে জন্মেছিলেন কনফুসিয়স ও লাওৎসে কনফুসিয়স নামটার ঠিক বানান হল কং ফু-ৎসে। ধর্ম প্রবর্তক বলতে যা বোঝায় এঁরা সেরকম ছিলেন না। এঁরা কতকগুলি নীতি ও সমাজব্যবস্থা বেঁধে দিয়েছিলেন। এঁদের নীতিশাস্ত্র শিক্ষা দিত কোন্ কাজ করা উচিত, কোন্ কাজ অনুচিত। মৃত্যুর পর কনফুসিয়স ও লাওৎসের স্মৃতিরক্ষার জন্য চীন দেশে অনেক মন্দির নির্মিত হয়। হিন্দুদের কাছে যেমন বেদ ও খৃষ্টানদের কাছে যেমন বাইবেল, তেমনি এঁদের লিখিত গ্রন্থগুলি চীনদেশবাসী খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখে। চীনের লোকেরা যে এত ভদ্র, এত মার্জিতব্যবহারসম্পন্ন ও শিক্ষাদীক্ষায় এত উন্নত, তা অনেকখানিই কনফুসিয়সের প্রভাবে।

 ভারতবর্ষে ছিলেন মহাবীর ও বুদ্ধ। আজ যাকে আমরা জৈনধর্ম বলি তার প্রবর্তন করেন মহাবীর। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বর্ধমান, তাঁর মহত্ত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য তাঁকে তাঁর শিষ্যেরা মহাবীর উপাধি দিয়েছিল। বেশির ভাগ জৈন থাকে পশ্চিম-ভারত ও কাথিয়াওয়ার-অঞ্চলে। আজকাল তাদের প্রায়ই হিন্দু বলে ধরা হয়। কাথিয়াওয়ারে ও রাজপুতানার আবুপর্বতে কতকগুলি অতি সুন্দর জৈনমন্দির আছে। জৈনেরা অহিংসাকে পরম ধর্ম বলে মনে করে; কোনো প্রাণীকে আঘাত করা বা কষ্ট দেওয়া তাদের চোখে পাপ। শুনে আশ্চর্য হবে যে মহাবীরের সমসাময়িক গ্রীসের পাইথাগোরাস ছিলেন নিরামিষভোজী, তাঁর শিষ্য ও চেলাদের পক্ষে আমিষভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল।

 এবার গৌতমবুদ্ধের কথায় আসা যাক। তুমি তো জানোই, তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয়, একজন রাজকুমার। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থের জননীর নাম মায়া। বুদ্ধের বংশপরিচয়ে রাজরানী মায়ার যে বর্ণনা আছে সেটা এখানে তুলে দিই: “সর্বলোকপূজিতা, নবচন্দ্রমাসদৃশ রূপবতী, বসুমতীর মতো ধীরা, বিকশিত পদ্মের মতো নির্মলা ছিলেন মহীয়সী মায়াদেবী।”

 সিদ্ধার্থের বাবা আর মা তাঁকে আরাম ও বিলাসিতার মধ্যে লালনপালন করতেন। সর্বদা চেষ্টা করতেন যাতে দুঃখদুর্দশার দৃশ্য তাঁকে কখনও না দেখতে হয়। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় কী করে। কিংবদন্তীতে জানা যায়, সিদ্ধার্থ দারিদ্র্য, দঃখ, কষ্ট এবং মৃত্যু সবই দেখেছিলেন এবং এইসব দৃশ্য দেখে তাঁর মনে গভীর বেদনার সঞ্চার হয়। রাজপ্রাসাদের সুখ তাঁর আর ভালো লাগল না। ভোগবিলাসের আড়ম্বর, সুন্দরী স্ত্রীর ভালোবাসা-সব-কিছুই তাঁর কাছে অকিঞ্চিৎকর মনে হতে লাগল। তিনি মানুষের দুঃখের কথা এবং কী উপায়ে সেই দঃখ দূর করা যায়, সেই কথা ভাবতে লাগলেন। আর তিনি চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না; একদিন গভীর রাত্রে রাজপুরী ত্যাগ করে, প্রিয়পরিজন সবাইকে ত্যাগ করে রাজার কুমার বেরিয়ে পড়লেন। যেসব প্রশ্ন তাঁর মনে উদয় হয়েছে তার জবাব খুঁজে বার করতে হবে। কত দিন ধরে শ্রান্তি ক্লান্তি তুচ্ছ করে তিনি সন্ধান করে বেড়ালেন। অবশেষে অনেক বৎসর পর, গয়ার কাছে একটি অশ্বত্থগাছের তলায় দীর্ঘ তপস্যার পর তিনি প্রজ্ঞা লাভ করেন এবং সিদ্ধ হন। সেই থেকে সিদ্ধার্থের নাম হয় ‘বুদ্ধ’, অর্থাৎ জ্ঞানী। যে গাছটির তলায় তিনি সাধনা করেছিলেন তার নাম ‘বোধিবৃক্ষ’। কাশীর কাছে সারনাথের উদ্যানে বুদ্ধ সর্বপ্রথম তাঁর ধর্ম প্রচার করেন। তাঁর ধর্মের মূল কথা হল সৎভাবে জীবনযাপন করার পথনির্দেশ করা। দেবতার উদ্দেশে কোনো জীবকে বলি দেওয়া তিনি অন্যায় মনে করতেন। তিনি বলতেন, যদি বলি দিতে হয় তো রাগ দ্বেষ ঘৃণা প্রভৃতি মোহকেই বলি দেওয়া উচিত।