বুদ্ধের আবির্ভাব যখন হয় সে সময়ে ভারতের প্রচলিত ধর্ম ছিল বৈদিক ধর্ম। তখন থেকেই এই ধর্মের অবনতি শুরু হয়ে গেছে। ব্রাহ্মণেরা যাগযজ্ঞ, পূজাপার্বণ, অন্ধ কুসংস্কার দ্বারা সত্যধর্মকে কলুষিত করেছে। আর তা তো করবেই, কারণ পূজা যত হয় ততই ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা মেলে। ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে ভেদ তীব্রতর হল। জপতপ মন্ত্রতন্ত্র প্রভৃতি কুসংস্কারের ভয় দেখিয়ে স্বার্থান্বেষী পুরোহিতের দল সমাজের নিম্নস্তরের লোকদের মন আচ্ছন্ন করে ফেলল। এইভাবে দেশের জনসাধারণকে নিজেদের বশে এনে ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দের রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। যখন এই দুই উচ্চ জাতির মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, বুদ্ধ ঠিক সেই সময় বৈদিক ধর্মের অনাচার ও পুরোহিতদের যথেচ্ছাচারের বিরূদ্ধে দাঁড়ালেন। মানুষ যাতে সৎভাবে জীবনযাপন করে, পূজা বলি প্রভৃতি নিরর্থক কাজ থেকে বিরত হয়ে যাতে তারা ভালো কাজে আত্মনিয়োগ করে, তারই জন্য চেষ্টা করেছিলেন বুদ্ধদেব। তাঁর শিক্ষাকে যারা জীবনের রত হিসাবে গ্রহণ করল তাদের বলা হত ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী। এই ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের নিয়ে তিনি তাঁর ‘সংঘ’ গঠন করলেন।
অনেক কাল একটি বিশেষ ধর্ম বলে বুদ্ধের ধর্ম ভারতে স্বীকৃত হয় নি। এর পর আমরা দেখতে পাব কেমন করে এই ধর্ম দেশময় ছড়িয়ে পড়ল ও কিছু কাল পরে আবার কেমন সমস্ত দেশ থেকেই যেন বিলুপ্ত হয়ে গেল। একদিকে সিংহল থেকে আরম্ভ করে সুদূর চীন দেশ অবধি বৌদ্ধধর্ম তার প্রভাব বিস্তার করল, তেমনি আবার অন্যদিকে বুদ্ধের জন্মভূমি এই ভারতে বুদ্ধের ধর্ম শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যধর্ম অথবা হিন্দুধর্মের অঙ্গীভূত হয়ে গেল। তবে এ কথা সত্য যে, এককালে ব্রাহ্মণ্যধর্মের উপর বৌদ্ধধর্ম প্রচুর প্রভাব বিস্তার করেছিল, ক্রিয়াকর্ম যাগযজ্ঞের অনেকগুলি কুসংস্কার দূর করতে পেরেছিল—সেটাও কম কথা নয়।
বর্তমান জগতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোকের ধর্ম হল বৌদ্ধধর্ম। মাথাগুণতির হিসাবে বৌদ্ধধর্মের পরেই স্থান হল খৃষ্টধর্ম, ইসলাম ও হিন্দুধর্মের। ইহুদি, শিখ ও পার্শিদের ধর্মও উল্লেখযোগ্য। ধর্ম ও ধর্মগুরুরা ইতিহাসে একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন, এঁদের বাদ দিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা সম্পূর্ণ হতে পারে না। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বড়ো বড়ো ধর্মের প্রবর্তক যাঁরা তাঁরা পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় মানুষদের মধ্যে অন্যতম। তাঁদের শিষ্য ও অনুগামীরা অনেক সময় গুরুর মহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। ইতিহাসে আমরা প্রায়ই লেখি যে, যে ধর্ম আমাদের উন্নতি ও মঙ্গলের পথে অগ্রসর করে দেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই ধর্মই আমাদের পাশবিকতার নিম্নতম স্তরে নামিয়ে নিয়ে গেছে। জ্ঞানের বিশুদ্ধ জ্যোতির জায়গায় এনেছে অজ্ঞানের অন্ধকার, মনকে উদার মুক্তির প্রশস্ত ক্ষেত্রে উপনীত না করে তাকে সংকীর্ণ, অনুদার ও পরধর্মের প্রতি অসহিষ্ণু করেছে। ধর্মের নামে একদিকে অনেক বড়ো বড়ো কাজ হয়েছে। অপরদিকে আবার লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণনাশ প্রভৃতি কত-যে পাপ সাধিত হয়েছে তারও ইয়ত্তা নেই।
তা হলেই মনে হয়, ধর্ম নিয়ে কী করা উচিত? কারও কারও কাছে ধর্ম মানেই স্বর্গ কিংবা ওই ধরনের একটা পরলোক। স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় তারা ধর্মানুষ্ঠান করে। এ যেন জিলিপির মতো কোনো-একটা মিষ্টি জিনিষের লোভে দুষ্টু ছেলের লক্ষ্মী হয়ে থাকা। সচরাচর ভদ্রবাড়ির সন্তানেরা তো এরকম করে না। সুতরাং ভেবে দেখো, পরিণতবয়স্কেরা যদি এরকম কাজ করতে শুরু করেন তা হলে সেটা কীরকম হাস্যকর হয়। আসলে জিলিপির প্রতি লোভ ও স্বর্গের প্রতি লোভের মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। লোভী অল্পবিস্তর আমরা সকলেই। কিন্তু আমরা ছেলেমেয়েদের এমনভাবে মানুষ করতে চাই যাতে তারা নির্লোভ হয়, নিঃস্বার্থ হয়। আদর্শের ক্ষেত্রে স্বার্থটা বড়ো হয়ে উঠলে চলে না। তা যদি হয় তা হলে জীবনকে বড়ো আদর্শের অনুগামী করে গড়ে তোলা যায় না।
আমরা সকলেই নিজেদের কীর্তির ফলাফল নিজের চোখে দেখে নিতে চাই। এটা মানুষের স্বভাবসিদ্ধ। কিন্তু দেখতে হবে আমাদের লক্ষ্যটা কোন দিকে? আমরা কি কেবল নিজেদের নিয়ে বিব্রত থাকি—নিজেদের মঙ্গলটুকু চাই? সমাজের, দেশের, সমগ্র মানবজাতির যাতে মঙ্গল