হয়—সেটা আমরা চাই কি? দশের মঙ্গলেই তো আমাদেরও মঙ্গল। কিছুদিন আগে আমার একটি চিঠিতে একটি সংস্কৃত শ্লোকের উল্লেখ করেছি। সেই শ্লোকটির তাৎপর্য হল এই যে, ব্যক্তি পরিবারের কাছে, পরিবার সমাজের কাছে ও সমাজ দেশের কাছে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন করবে। আজ ভাগবত থেকে একটি শ্লোকের অনুবাদ দিচ্ছি: “আমি অষ্টসিদ্ধিসংযুক্ত পরমা শান্তি চাই না; পুনর্জন্মের দুঃখ থেকে নিবৃত্তি—তাও আমার কাম্য নয়। জীবজগতের সমস্ত ক্লেশ আমি বরণ করে নিতে চাই, তাদের দুঃখ নিজের বলে স্বীকার করে আমি তাদের দুঃখ মোচন করতে চাই।”
এক ধর্মের লোক বলে এই, অন্য ধর্মের লোক বলে আর। পরস্পর পরস্পরকে দোষ দেয়, বলে নির্বোধ, বলে দুষ্ট। এদের মধ্যে সত্য কথা বলে কে? চক্ষুকর্ণের প্রমাণের বাইরের বিষয় নিয়ে যখন কারবার তখন এদের মধ্যে বিবাদভঞ্জন করা সহজসাধ্য নয়। বিজ্ঞজনের মতো এদের এইসমস্ত কথা আলোচনা করাই বেয়াদবি। মতামত নিয়ে যখন মাথা ভাঙাভাঙি হয় তখনই বিপদ। আমরা বেশির ভাগ লোকই সংকীর্ণমনা, জ্ঞানবুদ্ধিও আমাদের সীমাবদ্ধ। সবটুকু সত্য আমরা জেনে ফেলেছি, এ বিশ্বাসটা আস্পর্ধাবিশেষ। সেই সত্য জোর করে যখন অন্য লোককে স্বীকার করাতে চেষ্টা করি তখন সেটা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। সত্য কারও একচেটিয়া নয়। ফলকে কেউ গাছ বলে ভ্রম করে না। কেউ কেবল যদি ফলটাই দেখে, কারও কাছে যদি পাতা কিংবা কাণ্ডটাই বড়ো হয়ে দেখা দেয়, তা হলে তারা কেবল গাছের অংশবিশেষ দেখেছে। বিশেষ বিশেষ অংশকে সমগ্র গাছ বলে ভুল করা ও তাই নিয়ে পরস্পরের মধ্যে মারামারি করা—এর চাইতে বোকামি আর কিছুই হতে পারে না।
দুঃখের বিষয়, পরলোকের প্রতি আমার তেমন অনুরাগ নেই। ইহলোকে আমার কী করা উচিত এইটেই আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। বর্তমানের পথটা আমি যদি ঠিকমতো দেখতে পাই তা হলেই ব্যস—তার বেশি কিছুতে আমার দরকার নেই। এখানকার কাজ ঠিকমতো করে চলতে পারি যদি তা হলে কী হবে আমার পরলোকের কথা ভেবে।
বড়ো হয়ে নানা ধরনের লোক দেখতে পাবে—কেউ ধর্ম নিয়ে থাকে, কেউ ধর্মের তোয়াক্কা করে না, কেউ আবার দুদিককারই আতিশয্য পরিহার করে চলে। অনেক বড়ো বড়ো ধর্মমন্দির ও ধর্ম প্রতিষ্ঠান আছে, প্রচুর তাদের অর্থসম্পত্তি, প্রচুর ক্ষমতা। কখনও তারা সদুদ্দেশ্যে তাদের অর্থ ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে, কখনও-বা মন্দ কাজে। অনেক ধার্মিক লোক আছে যারা ভালো লোক বলে সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে, আবার অনেক ভণ্ড বদমাইশ আছে যারা ধর্মের নাম করে মানুষ ঠকিয়ে খায়। এসমস্ত দেখে-শুনে তোমার নিজের পথটি বেছে নিতে হবে। অন্যদের উদাহরণ থেকে অনেক-কিছু শেখা যায় সত্য, কিন্তু ঠেকে শেখা কিংবা নিজের চেষ্টায় শেখাটাই সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা। কতকগুলি সমস্যা আছে যার সমাধান আমাদের নিজেদেরই করতে হয়, তা ছাড়া গতি নেই।
চট করে একটা মতামত স্থির করে বোসো না যেন। একটা বড়োরকমের সিদ্ধান্তে পৌঁছবার আগে নিজেকে নানা দিক থেকে তৈরি করে নিতে হয়। নিজের ভাবনা নিজে ভেবেচিন্তে, কর্তব্যাকর্তব্য নিজেই নির্ধারণ করা—একশোবার উচিত। কিন্তু সবাই তা পারে না। নবজাত শিশু তার ভালো-মন্দ বুঝে কাজ করতে পারে কি? এমন অনেকে আছে যারা বয়সে প্রবীণ হলেও বুদ্ধিশুদ্ধিতে প্রায় কচি ছেলের মতো।
অন্যান্য দিনের চেয়ে এ চিঠি অনেক বড়ো হয়ে গেল। এত লম্বা চিঠি পড়তে তোমার হয়তো ভালো লাগবে না। ধর্ম বিষয়ে আমার বক্তব্যগুলো বলে আমি খালাশ। আজ যদি আমার সব কথা তুমি বুঝতে নাও পারো, তাতে কিছু আসে যায় না। কিছুদিন পর আপনা থেকেই বুঝতে পারবে।