১৫
পারশ্য এবং গ্রীস
২১শে জানুয়ারি, ১৯৩১
তোমার চিঠি আজ পেলাম। মা ও তুমি দুজনেই ভালো আছ জেনে খুশি হয়েছি। কিন্তু তোমার দাদুর অসুখে যে সারছে না, ওঁর জ্বরটা ছাড়লে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত। উনি সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, এখন এ বয়সে যে শান্তি এবং বিশ্রাম দরকার তাও পাচ্ছেন না।
তুমি যে দেখছি লাইব্রেরি থেকে অনেক বই পড়ে ফেলেছ, আমার কাছ থেকে আরও সব বইয়ের নাম চেয়েছ। কিন্তু ইতিমধ্যে কী কী বই পড়েছ তার নাম তো আমাকে লেখ নি? বই পড়ার অভ্যাস খুবই ভালো; কিন্তু যারা তাড়াতাড়ি অনেক বই পড়ে ফেলে তাদের বেলায় একটু সন্দেহ হয়। মনে হয় বোধ করি ভালো করে পড়ে নি, কোনোরকমে চোখ বুলিয়ে গেছে, আজ পড়ছে তো কাল ভুলে যাচ্ছে। পড়বার মতো বই যদি হয় তবে তা বেশ যত্ন করে খুঁটে খুঁটে পড়াই ভালো। এমন বইও অনেক আছে যা মোটে পড়বার যোগ্যই নয়। এত বইয়ের মধ্যে থেকে ভালো বই বেছে নেওয়া কিছু চাট্টিখানি কথা নয়। তুমি হয়তো বলবে আমাদের লাইব্রেরি থেকেই যখন বই বেছে নিয়েছ তখন নিশ্চয় ভালো বই-ই হবে, কারণ তা নইলে আমরা এসব বই রাখব কেন? তা বেশ, বেশ, পড়ে যাও, আমি জেল থেকে তোমাকে যতটা পারি সাহায্য করব। শরীরে মনে তুমি কত তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠছ আমি অনেক সময়ে তাই ভাবি। তোমার কাছে যেতে ভারি ইচ্ছে করছে। এই-যে আমি তোমাকে যেসব চিঠি লিখছি, তোমার হাতে পৌঁছতে পৌঁছতে হয়তো তোমার বিদ্যে এসব চিঠির বিদ্যেকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে ততদিনে হয়তো চাঁদ[১] বড়ো হয়ে উঠবে, সে-ই তখন পড়বে। তা হলেই হল; একজন কেউ এর মর্ম বুঝলেই হল।
এবারে এসো গ্রীস এবং পারশ্যদেশের কথা একটু বলি, এই দুই দেশের মধ্যে যেসব যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছিল তার কথা একটু আলোচনা করা যাক। আগের এক চিঠিতে গ্রীসদেশের নগররাষ্ট্রগুলির কথা বলেছি; পারশ্যদেশের এক রাজা যে বিরাট এক সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন তারও উল্লেখ করেছি। গ্রীকরা এ রাজার নাম দিয়েছিল দারিয়ুস। দারিয়ুসের সাম্রাজ্য শুধুই যে বহু বিস্তৃত ছিল তাই নয়, খুব সুশৃঙ্খলও ছিল। এশিয়া মাইনর থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত এর সীমানা বিস্তার লাভ করেছিল। মিশররাজ্য এবং এশিয়া মাইনরের কতকগুলি গ্রীক নগরীও এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। এই বিরাট সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চমৎকার রাজপথ তৈরি হয়েছিল। তার সাহায্যে নিয়মিতরূপে সম্রাটদপ্তরের সংবাদপ্রেরণের ব্যবস্থা হত। কী কারণে দারিয়ুস স্থির করলেন গ্রীস দেশের নগর-রাষ্ট্রগুলি জয় করতে হবে। সেই সূত্রে এই দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ যুদ্ধে ঘটেছিল।
হিরোডটাস নামক একজন গ্রীক ঐতিহাসিকের লেখা থেকে আমরা এইসব যুদ্ধের বিবরণ পেয়েছি। এই যদ্ধের অল্পকাল পরেই তাঁর জন্ম হয়। অবশ্য গ্রীকদের প্রতি তিনি একটু পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন, তা হলেও তাঁর লেখা বিবরণগুলি বেশ চিত্তাকর্ষক। আমার এই চিঠিতে তাঁর ইতিহাস থেকে কিছু কিছু কথা উদ্ধৃত করব।
পারশ্যরাজের প্রথমবারের অভিযান সফল হয় নি। কারণ দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে গিয়ে তাঁর বহু সৈন্য রোগাক্রান্ত হয়ে এবং খাদ্যাভাবে মারা যায়। এমনকি গ্রীস পর্যন্ত তারা গিয়ে পৌঁছতেই পারে নি, তার আগেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। তার পরে আবার খৃষ্টপূর্ব ৪৯০ অব্দে দ্বিতীয় অভিযান হল। পারশ্যসৈনারা এবার স্থলপথে না গিয়ে সমুদ্রপথে অগ্রসর হল। এথেন্সের নিকটবর্তী ম্যারাথন-নামক একটি স্থানে তারা অবতরণ করল। এথেন্সবাসীরা
- ↑ শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের কন্যা চন্দ্রলেখা