তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল, কারণ পারশ্যসাম্রাজ্যের তখন বিষম প্রতিপত্তি। এমনকি ভয়ে তারা তাদের বহুকালের পুরোনো শত্রু স্পার্টার সঙ্গে মিতালি করবার চেষ্টা করল। বিদেশী শত্রুর আক্রমণ থেকে দেশরক্ষার জন্য তাদের সাহায্য প্রার্থনা করল। স্পার্টার সাহায্য এসে পৌঁছবার আগেই কিন্তু এথেন্সবাসীরা পারশ্যসেনাকে যুদ্ধে হারিয়ে দিল। এই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ম্যারাথনের যুদ্ধ হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব ৪৯০ অব্দে।
গ্রীসদেশের ছোট্ট একটি নগর-রাষ্ট্র কিনা এত বড়ো সাম্রাজ্যের সেনাদলকে হারিয়ে দিল—ভাবলে একটু অদ্ভুত ঠেকে। কিন্তু ব্যাপারটা বাইরে থেকে যতটা অদ্ভুত মনে হয়, আসলে ততটা নয়। গ্রীকরা লড়াই করেছিল নিজের ঘরের পাশে আপন দেশ রক্ষার জন্য; আর পরাশ্যসেনা দেশ ছেড়ে রাজ্য ছেড়ে এসেছিল অনেক দূরে। তার উপরে আবার তাদের পাঁচমিশালি সৈন্যদল, সাম্রাজ্যের সব অংশ থেকে জড়ো-করা। ওরা মাইনে-করা সৈন্য, লড়াই করেছে পয়সার খাতিরে। গ্রীসদেশ জয় হোক বা না হোক তা নিয়ে ওরা বড়ো একটা মাথা ঘামায় নি। অপর পক্ষে এথেন্সবাসীরা যুদ্ধ করেছে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। স্বাধীনতা হারানোর চেয়ে তারা মৃত্যুকেও শ্রেয় মনে করেছে। যারা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে মরণপণ করে তারা কখনও পরাজিত হয় না।
কাজেই দারিয়ুসকে ম্যারাথনের যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করতে হল। তাঁর মৃত্যুর পরে জেরিক্সিস হলেন পারশ্যের সম্রাট। জেরিসিক্সও মনে মনে গ্রীসজয়ের আশা পোষণ করেছিলেন। রাজা হয়ে তিনি গ্রীস-অভিযানের আয়োজন শুরু করলেন। এইখানে হিরোডটাসের লেখা একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী তোমাকে বলব। আর্তাবানাস ছিলেন জেরিক্সিসের পিতৃব্য। তিনি বুঝেছিলেন যে, গ্রীস-অভিযান অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল ব্যাপার—কাজেই তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করেছিলেন। জেরিক্সিস তাঁকে যে জবাব দিয়েছিলেন হিরোডটাসের বিবরণ থেকে এখানে তা উদ্ধৃত করে দিচ্ছি:
আপনি যা বলছেন তার মধ্যে যুক্তি আছে বটে, কিন্তু চারদিকে যদি কেবল বিপদ দেখে আঁৎকে উঠি তা হলে চলবে কেন? সব বিপদকে গ্রাহ্য করলে চলে না। সংসারে সকল ব্যাপারকে যদি একই মাপকাঠিতে যাচাই করতে যাই তা হলে কোনো কাজ করাই সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের জুজুটার ভয়ে সারাক্ষণ সশঙ্ক থেকে লাভ কী? না-হয় খানিকটা দুঃখভোগের হাত এড়ানো গেল। এর চেয়ে আমি বলি, আশাবাদী হয়ে ভবিষ্যতের সম্মুখীন হওয়াই শ্রেয়, তাতে যদি দুঃখভোগ করতে হয় সেও ভালো। সঠিক পন্থা নির্দেশ না করে কেবল যদি প্রত্যেক প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন তা হলে আপনিও দুঃখ পাবেন, অপর পক্ষও পাবে। প্রত্যেক কার্যেই সফলতা এবং বিফলতার সম্ভাবনা সমপরিমাণে থাকে। ভবিষ্যতের দাঁড়িপাল্লাটা কোন দিকে থাকবে মানুষ তা কেমন করে জানবে? তার পক্ষে সেটা জানা সম্ভব নয়। কিন্তু সফলতা তারাই অর্জন করে যারা এগিয়ে গিয়ে কাজে হাত দেয়। আর যারা ভীরু, যারা কেবল চুলচেরা হিসেব করে, তাদের পক্ষে সফলতার আশা সুদূরপরাহত। পারশ্যরাজ্য যে বিরাট শক্তি অর্জন করেছে সে কথা একবার ভেবে দেখুন। আমার যেসব পূর্বপুরুষ পারশ্যের সিংহাসনে বসেছেন তাঁরা যদি আপনার অনুরূপ মতামত পোষণ করতেন, কিংবা আপনার মতো পরামর্শদাতা যদি তাঁদের জুটত তা হলে আজকে পারশ্যরাজা এতদূর বিস্তৃত হতে পারত না। তাঁরা বিপদকে বরণ করতে প্রস্তুত ছিলেন বলেই আমাদের এই উন্নত অবস্থা। বৃহৎ জিনিষ লাভ করতে হলে কঠিন বিপদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
অনেকটা অংশ উদ্ধৃত করেছি, তার কারণ অন্যসব বিবরণের চেয়ে এই কথাগুলির দ্বারাই আমরা পারশ্যরাজকে ভালো করে বুঝতে পারি। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য দেখা গেল, আর্তাবানাস ঠিক পরামর্শই দিয়েছিলেন, গ্রীসদেশে পারশ্যসেনার পরাজয় হল। জেরিক্সিস পরাজিত হলেন বটে, কিন্তু তাঁর কথার মূল সুরটি যথার্থই সত্য, তার থেকে আমাদের সকলেরই কিছু শিক্ষণীয়