বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৫৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৩৮
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

আছে। এই-যে আজকে আমরা বৃহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজে নেমেছি, মনে রাখতে হবে, লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে বহু কঠিন বিপদের মধ্য দিয়ে আমাদিগকে যেতে হবে।

 সম্রাট জেরিক্সিস তাঁর বিরাট সৈন্যদল নিয়ে এশিয়া মাইনরের ভিতর দিয়ে রওনা হলেন। তার পরে দার্দানেলিস-প্রণালী অতিক্রম করে ইউরোপে পদার্পণ করলেন। তখন দার্দানেলিসের নাম ছিল হেলেস্‌পণ্ট্। পথিমধ্যে জেরিক্সিস ট্রয়নগরের ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করেছিলেন, সেই যেখানে প্রাচীনকালের গ্রীক বীরেরা হেলেনকে উদ্ধার করবার জন্য লড়াই করেছিলেন। হেলেস্‌পণ্ট্ প্রণালী পার হবার উদ্দেশ্যে সৈন্যদের জন্য বিরাট সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। পারশ্যসৈন্যদল যখন সেতু পার হয়ে যাচ্ছে তখন জেরিক্সিস তীরবর্তী একটি পাহাড়ের চূড়ায় মর্মর সিংহাসনে বসে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। হিরোডটাস লিখেছেন:

 সমস্ত হেলেস্‌পণ্ট্ জাহাজে পরিপূর্ণ এবং এবিডসের তীরভূমি ও প্রান্তরসমূহ লোকে লোকারণ্য, সেই দৃশ্য দেখে জেরিক্সিস বললেন, ‘আমি আজ সত্যই সুখী’; কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, তিনি কাঁদতে লাগলেন। পিতৃব্য আর্তাবানাস—সেই যিনি প্রথমে জেরিক্সিসকে গ্রীস-অভিযান থেকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করেছিলেন—তিনি তাঁকে কাঁদতে দেখে বললেন, ‘রাজন্, অল্প সময়ের মধ্যে তোমার এ কী মতিপরিবর্তন! এইমাত্র তুমি নিজ মুখে আহ্লাদ প্রকাশ করছিলে আর পরমুহূর্তেই দেখছি তোমার চোখে জল।’ জৌরক্সিস বললেন, ‘এই দৃশ্য দেখে হঠাৎ আমার মনে হল মানুষের জীবন কী ক্ষণস্থায়ী! এই-যে চতুর্দিকে অগণিত মানুষ দেখছি, একশত বৎসর পরে এর একজনও পৃথিবীতে জীবিত থাকবে না’।

 যা হোক, সেই বিরাট সৈনাদল স্থলপথে অগ্রসর হল আর বহুসংখ্যক জাহাজ সমুদ্রপথে তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলল। কিন্তু সমুদ্রের দেবতা বোধহয় গ্রীকদের পক্ষেই যোগ দিয়েছিলেন, কারণ হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় উঠে বেশির ভাগ জাহাজ একেবারে বিনষ্ট হয়ে গেল। ওদিকে এত বড়ো বিরাট সৈন্যদল দেখে গ্রীকরা সত্যই ভয় পেয়ে গেল। তাদের পুরাতন আত্মকলহ সব ভুলে গিয়ে তারা সমবেতভাবে আক্রমণকারীর প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হল। প্রথম দিকটায় পশ্চাৎঅপসরণ করে তারা থার্মোপোলি-নামক স্থানে পারশ্যসেনাকে ঠেকাবার চেষ্টা করল। সেই স্থানটি একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ গিরিপথ—তার একদিকে পাহাড়, অপরদিকে সমুদ্র। কাজেই এখানে অল্পসংখ্যক লোকও একটি বৃহৎ সেনাদলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত। মাত্র তিন শত স্পার্টান-সমেত গ্রীক বীর লিওনিডাস মরণপণ করে সেই গিরিপথ রক্ষার জন্য দণ্ডায়মান হলেন। ম্যারাথনের যুদ্ধের ঠিক দশ বৎসর পরে সেই স্মরণীয় দিনে এইসব বীর সন্তান দেশমাতৃকার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছিল। পারশ্যসেনার গতিরোধ করে তারা গ্রীক সৈন্যদলকে পশ্চাদপসরণের সুযোগ দিল। সেই সংকীর্ণ গিরিপথে এক-একজন এসে শত্রুর গতিরোধ করছে, প্রাণ দিচ্ছে, তৎক্ষণাৎ আর একজন তার স্থান গ্রহণ করছে। পারশ্যসেনার অগ্রগতি একেবারে রুদ্ধ। লিওনিডাস এবং তাঁর তিন শত সঙ্গীর প্রত্যেকে থার্মোপোলির রণক্ষেত্রে ধরাশায়ী হল—তবে পারশ্যসেনা অগ্রসর হতে পারল। খৃষ্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে এই ঘটনা ঘটেছিল অর্থাৎ ঠিক দু হাজার চার শো দশ বৎসর পূর্বে; কিন্তু আজও তাদের সেই অজেয় বিক্রমের কথা ভাবলে দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। থার্মোপোলিতে গেলে লোকে আজও দেখতে পাবে লিওনিডাস এবং তাঁর সঙ্গীদের বাণী খোদিত রয়েছে প্রস্তরফলকে—

 হে পথিক, যাও, স্পার্টায় গিয়ে বলো, তাদের আজ্ঞা পালন করে আমরা অবহেলে প্রাণ বিসর্জন করলাম।

 যে অমিত বিক্রম মত্যুকেও জয় করে তার তুলনা নেই। লিওনিডাস এবং থার্মোপোলি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, সুদূর ভারতবর্ষে আমরাও যখন সে কথা ভাবি আমাদেরও প্রাণে রোমাঞ্চ