জাগে। এখন ভেবে দেখো দেখি, আমাদেরই দেশের নরনারী, আমাদেরই পূর্বপুরুষ, যাঁরা ইতিহাসের প্রারম্ভকাল থেকে হাসিমুখে মৃত্যুকে উপেক্ষা করেছেন, অসম্মান এবং দাসত্বের চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছেন, শত নির্যাতনেও যাঁরা মস্তক অবনত করেন নি—ভেবে দেখো, তাঁদের কথা মনে হলে আমাদের কতখানি গর্ব হওয়া উচিত। চিতোর এবং চিতোরের অতুলনীয় ইতিহাসের কথা ভেবে দেখো, রাজপুত নরনারীর অত্যাশ্চর্য বীরত্বের কাহিনী একবার স্মরণ করো। আর এই আজকের দিনেই দেখো-না—আমাদেরই সঙ্গীদল, আমাদেরই মতো ধমনীতে যাঁদের উষ্ণ রক্ত-স্রোত বইছে—ভারতের মুক্তিসংগ্রামে তাঁরাও তো মৃত্যুভয়ে ভীত হন নি।
থার্মোপোলিতে বাধা পেয়ে কিছুকালের জন্য পারশ্যসেনার অগ্রগতি বন্ধ রইল, কিন্তু বেশি দিন নয়। গ্রীকরা কেবলই পিছু হটে যেতে লাগল; কোনো কোনো গ্রীকনগরী শত্রুর কাছে বশ্যতা স্বীকার করল। গর্বিত এথেন্সবাসীরা কিন্তু আত্মসমর্পণ করার চেয়ে নগর ত্যাগ করে যাওয়াই শ্রেয় মনে করল। সমস্ত অধিবাসী একযোগে নগর ত্যাগ করে চলে গেল, বেশির ভাগই পালাল সমুদ্রপথে। পারশ্যসেনা সেই জনমানবহীন নগরীতে প্রবেশ করে সব পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। কিন্তু গ্রীকদের নৌবহর তখনও অক্ষত রয়েছে। স্যালামিস্-নামক স্থানে বিরাট এক জলযুদ্ধ হল, তাতে পারশ্য-নৌবহর সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে গেল। এই পরাজয়ের আঘাতে সম্রাট জেরিক্সিস ভগ্নমনোরথ হয়ে পারশ্যে ফিরে এলেন।
এর পরেও কিছুকাল পারশ্য সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ ছিল, কিন্তু ম্যারাথন এবং স্যালামিসেই পতনের সূচনা দেখা দিয়েছিল। কী করে পতন ঘটল পরে সে কথা বলব। এত বড়ো সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে দেখে সে যুগের লোকেরা নিশ্চয় খুব বিস্মিত হয়েছিল। হিরোডটাস এই পতনের কারণ সম্বন্ধে চিন্তা করেছিলেন এবং এ বিষয়ে একটি নীতিসূত্রও উদ্ধার করেছিলেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক জাতির ইতিহাসে তিনটি পর্যায় আছে—প্রথম পর্যায়ে সাফল্য, দ্বিতীয় পর্যায়ে সাফল্যজনিত অহমিকা এবং অন্যায়ের প্রশ্রয়, সর্বশেষে এরই ফলে অধঃপতন।
১৬
গ্রীসের বিগত গৌরব
২৩শে জানুয়ারি, ১৯৩১
গ্রীকরা যে পারশ্যসেনাকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিল তার ফল হল প্রধানত দুটি। পারশ্যসাম্রাজ্যে ভাঙন ধরল, ক্রমে তারা দুর্বল হয়ে পড়ল; অপর পক্ষে শুরু হল গ্রীক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবের যুগ। একটি জাতির দীর্ঘ জীবনের তুলনায় এই গৌরব অবশ্য খুবই স্বল্পস্থায়ী। গ্রীসের গৌরবের যুগ পুরো দু শো বছরও স্থায়ী হয় নি। পারশ্য অথবা অন্যান্য প্রাচীন সাম্রাজ্যের মতো এদের গৌরবের কাহিনী রাজ্যবিস্তারের কাহিনী নয়। পরে অবশ্য আলেকজাণ্ডারের অভ্যুদয় হয়েছিল এবং অল্পকালের জন্য তাঁর বিজয় অভিযান সমস্ত পৃথিবীকে চমকিত করেছিল। যাক, তাঁর সম্বন্ধে পরে আলোচনা করা যাবে। ইতিমধ্যে আমরা পারশ্যযুদ্ধ এবং আলেকজাণ্ডারের অভ্যুদয়ের মধ্যকাল সম্বন্ধে অর্থাৎ থার্মোপোলি এবং স্যালামিসের যুদ্ধের পরবর্তী শ-দেড়েক বছরের ইতিহাস আলোচনা করছি। পারশ্যসম্রাটের আক্রমণের ভয়ে গ্রীকরা একতাবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সেই আশঙ্কা দূরে হবামাত্রই একতাসূত্রটি ছিন্ন হয়ে গেল, আবার শুরু হল বিবাদ-বিসংবাদ। বিশেষ করে এথেন্স এবং স্পার্টা—এই দুটি নগর-রাষ্ট্রের মধ্যে ঘোরতর বিরোধ ছিল। অবশ্য তাদের বিরোধের কাহিনী এখানে অবান্তর, কারণ, এর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই। সে যুগে গ্রীস অত উন্নত হয়েছিল বলেই তাদের বিবাদ-বিসংবাদ আমরা আজও মনে করে রেখেছি।