প্রাচীন গ্রীসের মুষ্টিমেয় কয়েকখানি গ্রন্থ, কয়েকটি মূর্তি এবং কিছু ধ্বংসাবশেষ মাত্র আমাদের সম্বল। কিন্তু তাই যথেষ্ট; এই কটি নিদর্শন থেকেই আমরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব উপলদ্ধি করতে পারি। সে যুগের গ্রীকরা সর্ব বিষয়ে কতখানি উন্নতিলাভ করেছিল তা দেখে বিস্মিত হতে হয়। তাদের অপূর্ব ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যের নিদর্শনগুলি দেখলে তবেই বোঝা যায়, কতখানি ছিল তাদের ধীশক্তি আর শিল্পচাতুর্য। ফিডিয়াস ছিলেন সে যুগের খ্যাতনামা ভাস্কর—তিনি ছাড়াও আরও অনেকে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। এ ছাড়া গ্রীকদের রচিত নাটক— বিয়োগান্ত মিলনান্ত দুই-ই, এখনও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাটকের মধ্যে স্থান পাবার যোগ্য। সফোক্লিস, এস্কাইলাস, ইউরিপিডিস, এরিস্টোফেনিস, পিণ্ডার, মিনাণ্ডার এবং সাফো—এসব নাম বোধকরি তোমার কাছে এখন অর্থহীন মনে হবে। কিন্তু বড়ো হয়ে যখন তুমি এঁদের বই পড়বে তখন নিশ্চয় গ্রীসের গৌরবের কথা তুমি কতকটা বুঝতে পারবে।
কোন্ দেশের ইতিহাস ঠিক কীভাবে পড়া উচিত গ্রীক ইতিহাসের এই যুগটির কথা ভাবলেই আমরা তা বুঝতে পারব। সে যুগের গ্রীক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যে যুদ্ধবিগ্রহ এবং ছোটোখাটো বিবাদ-বিসংবাদ চলছিল কেবলমাত্র সেই দিকেই যদি আমরা নজর দিই তবে গ্রীকদের সম্বন্ধে সত্যিকার কতটকু আমরা জানলাম, কতটুকু বুঝলাম? তাদের ভালো করে জানতে হলে তাদের চিন্তা-জগতে প্রবেশ করতে হবে। তারা কী ভেবেছে, কী করেছে তার সম্যক্ উপলদ্ধি চাই। মননের ইতিহাসই হল আসল ইতিহাস। এইজন্য বলা যেতে পারে, বর্তমান ইউরোপের ইতিহাস অনেকাংশে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার বংশধর মাত্র।
বিভিন্ন জাতির জীবনে এই ধরনের উন্নত যুগে কীভাবে এসেছে গিয়েছে তার পর্যালোচনা বড়োই চিত্তাকর্ষক। অকস্মাৎ বিদ্যুৎচমকে সমস্ত কিছু উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, নরনারী সকলে নব নব সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ব্যাপৃত হয়। দেশবাসী সকলে নূতন অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। আমাদের দেশেও এরকম যুগে এসেছে। সর্বপ্রথম যে গৌরবের যুগকে আমরা জানি সেটি হচ্ছে বেদ উপনিষদ এবং অন্যান্য গ্রন্থ রচনার যুগ। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই প্রাচীন যুগের কোনো গ্রন্থবদ্ধ ইতিহাস আমাদের নেই, সেদিনের কত কত অপূর্ব সৃষ্টি হয়তো একেবারে লোপ পেয়ে গেছে বা হয়তো লোকচক্ষুর অন্তরালে এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু সে যুগের যেটকু নিদর্শন আমাদের হাতে আছে তাতেই প্রমাণ হয়, প্রাচীন ভারতে কতবড়ো ধীশক্তিসম্পন্ন চিন্তাবীরদের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তী কালের ইতিহাসেও ভারতবর্ষে অনুরূপ গৌরবের যুগ এসেছে। আমাদের এই ইতিহাসপরিক্রমার সূত্রে ক্রমে ক্রমে সেসব যুগের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হবে।
যে সময়ের কথা বলছি তখন বিশেষ করে এথেন্স নগরী খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। একজন মস্ত বড়ো রাজনীতিজ্ঞ ছিলেন তার অধিনায়ক। তাঁর নাম ছিল পেরিক্লিস। ত্রিশ-বৎসর কাল এথেন্সের শাসনভার তাঁর হাতে ছিল। সে সময়ে এথেন্স নগরীর গরিমার অন্ত ছিল না—একদিকে সুদৃশ্য হর্ম্যে শোভিত, অপরদিকে বড়ো বড়ো শিল্পী এবং সুধীবৃন্দের বাসভূমি। এখনও সেকালের এথেন্সের কথা বলতে হলে আমরা বলি পেরিক্লিসের এথেন্স কিংবা পেরিক্লিসের যুগ।
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক হিরোডটাস ছিলেন ঐ যুগের একজন এথেন্সবাসী। এথেন্সের উন্নতির কারণ সম্বন্ধে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি স্বভাবতই একটু নীতিবাগীশ ছিলেন; এই সূত্রেও তিনি একটি নীতির উল্লেখ করেছেন। তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন:
এথেন্স ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠল—এর থেকেই প্রমাণ হয় এবং সর্বত্রই এর প্রমাণ মেলে যে, স্বাধীনতার ফল কখনও ভালো না হয়ে যায় না। এথেন্সবাসীরা যতদিন স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রের অধীনে ছিল ততদিন তারা সামরিক শক্তিতে অন্যান্য রাষ্ট্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল না। কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের অবসান হওয়ামাত্র তারা শক্তিতে আর সকলকে ছাড়িয়ে গেল। এর থেকে দেখা যাচ্ছে, পরাধীন অবস্থায় তারা আপন শক্তির পূর্ণ ব্যবহার করে নি, কেবলমাত্র প্রভুর আজ্ঞা পালন করেছে। কিন্তু স্বাধীনতালাভের পরে প্রত্যেকটি ব্যক্তি বেচ্ছায় আপন শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছে।