সে যুগের মহারথীদের মধ্যে কয়েকজনের নাম ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। কিন্তু এদের মধ্যে যিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ, এমনকি যাঁকে সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম বলা চলে, তাঁর নাম এখনও করা হয় নি। তাঁর নাম সক্রেটিস। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক এবং জ্ঞানযোগী, নিরন্তর সত্যের সন্ধানে রত। প্রকৃত জ্ঞানলাভ করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র অভিলাষ। বন্ধুবান্ধব পরিচিতদের সঙ্গে তিনি প্রায়ই কঠিন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। আলোচনা-প্রসঙ্গে প্রকৃত সত্য যাতে উদ্ঘাটিত হতে পারে, এই ছিল উদ্দেশ্য। তাঁর অনেক-সব শিষ্য অথবা চেলা ছিল, তাদের মধ্যে সর্বপ্রধান ছিলেন প্লেটো। প্লেটো অনেক বই লিখে রেখে গেছেন। সেসব বই থেকে আমরা তাঁর গুরু সক্রেটিস সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারি। প্রায়ই দেখা যায়, যারা নূতন নূতন তত্ত্বানুসন্ধানে লিপ্ত, শাসক সম্প্রদায় তাদের বড়ো একটা সুনজরে দেখে না, সত্যানুসন্ধান তারা পছন্দ করে না। পেরিক্লিসের অব্যবহিত পরেই যাঁরা এথেন্সের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা সক্রেটিসের ভাবভঙ্গি, মতামত পছন্দ করতেন না। এঁদের হুকুমে সক্রেটিসের বিচার হল এবং বিচারের ফলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হল। কর্তারা বললেন, সক্রেটিস যদি লোকজনের সঙ্গে ঐসব আলোচনা বন্ধ করেন এবং তাঁর মতিগতি পরিবর্তন করেন তবে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু সক্রেটিস তাতে রাজি হলেন না; যা কর্তব্য বলে জেনেছেন তা ত্যাগ করার চেয়ে বিষপাত্র গ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করাই তিনি শ্রেয় মনে করলেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর বিচারক এবং এথেন্সবাসীদের সম্বোধন করে বলেছিলেন:
আমি আমার সত্যানুসন্ধানের ব্রত ত্যাগ করব এই শর্তে আপনারা আমাকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত আছেন। তার উত্তরে আমি এথেন্সবাসীদের বলব, আপনাদিগকে সহস্র ধন্যবাদ। কিন্তু আপনাদের আদেশ পালনে আমি অক্ষম, কারণ আমি ভগবানের আদেশ শিরোধার্য করে নিয়েছি। তিনিই আমাকে এ কার্যে নিয়োজিত করেছেন। যতদিন আমার দেহে প্রাণ আছে ততদিন এই জ্ঞানান্বেষণের ব্রত থেকে আমি বিরত হব না। আমার অভ্যস্ত প্রথানুযায়ী যে-কোনো ব্যক্তির সঙ্গেই আমার সাক্ষাৎ হবে, সম্বোধন করে বলব, ‘তুমি যে জ্ঞান এবং সত্যানুসন্ধান ছেড়ে, আপন আত্মার কল্যাণচিন্তা ভুলে গিয়ে, কেবলমার অর্থ এবং যশের পিপাসায় মত্ত হয়ে আছ, এ কি ঘোরতর লজ্জার কথা নয়?’ মৃত্যু কী জিনিষ আমি জানি না, কে জানে এর ফল কল্যাণকর হতেও-বা পারে, সুতরাং আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। আমি শুধু এইটুকু জানি, কর্তব্য কাজ থেকে বিরত হওয়া অন্যায়। যাকে নিশ্চিত অন্যায় বলে জানি তার চেয়ে যাতে কল্যাণের সম্ভাবনা হয়তো-বা নিহিত আছে সেই মৃত্যুকেই আমি অধিক বরণীয় মনে করি।
সক্রেটিস যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রাণ দিয়ে সত্য এবং জ্ঞানের সাধনা করে গিয়েছেন; সেই সাধনা আরও বেশি সার্থকতা লাভ করেছে তাঁর মৃত্যুতে।
আজকাল সাম্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং আরও কত কত সমস্যা সম্বন্ধে তোমরা নানা আলাপ-আলোচনা শুনছ কিংবা পড়ছ। পৃথিবীতে দুঃখদৈন্য অবিচার অনেক রয়েছে। বর্তমান বিধিব্যবস্থায় অনেকেরই আস্থা নেই, তাঁরা এসব বদলাতে চান। রাষ্ট্রপরিচালনা সম্বন্ধে প্লেটোও অনেক কথা ভেবেছেন, অনেক-কিছু, লিখেও গেছেন। তাতেই দেখা যাচ্ছে, সেই যুগের লোকেরাও দেশের রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলবার কথা ভেবেছেন যাতে সর্বসাধারণের সুখস্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানো যায়।
প্লেটো যখন প্রায় বৃদ্ধ হয়ে এসেছেন তখন আর-একজন গ্রীক পণ্ডিত ক্রমে খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। তাঁর নাম এরিস্টটল্। তিনি ছিলেন মহাবীর আলেকজাণ্ডারের গৃহশিক্ষক। পরে আলেকজাণ্ডার তাঁকে বহুপ্রকারে সাহায্য করেছিলেন। সক্রেটিস এবং প্লেটোর ন্যায় এরিস্টটল্ দার্শনিকতত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামান নি। প্রকৃতির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার দিকেই তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। একে বলা যায় প্রকৃতিদর্শন কিংবা আজকালকার ভাষার যাকে বলে বিজ্ঞান। এই হিসাবে এরিস্টটল্ পৃথিবীর প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিকদের অন্যতম।