এর পরে আমরা এরিস্টটলের শিষ্য আলেকজাণ্ডারের জীবনকাহিনী আলোচনা করব। কিন্তু সেটি হবে কালকে, আজকে ঢের লেখা হয়ে গেছে।
আজকে বসন্ত পঞ্চমী, আজ থেকে বসন্তঋতুর সূচনা। আমাদের স্বল্পস্থায়ী শীতঋতু শেষ হয়ে গেল, বাতাসে আর সেই কনকনে ভাবটা নেই। ক্রমেই পাখির দল এসে ভিড় করছে আর পাখির গানে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠছে। পনেরো বৎসর আগে দিল্লি নগরে ঠিক এই দিনটিতে তোমার মায়ের আর আমার বিয়ে হয়েছিল!
১৭
দিগ্বিজয়ী বীর কিন্তু গর্বান্ধ যুবক
২৪শে জানুয়ারি, ১৯৩১
আমার গত চিঠিতে এবং তার আগেও মহাবীর আলেকজাণ্ডারের নাম উল্লেখ করেছি। বোধকরি বলেছিলাম, তিনি জাতিতে গ্রীক। সেটা কিন্তু পুরোপরি ঠিক নয়। গ্রীস দেশের উত্তর দিক ঘেঁষে মাসিডন নামে একটি দেশ আছে, তিনি আসলে সেই দেশের অধিবাসী। মাসিডনের অধিবাসীরা অনেকাংশে ছিল গ্রীকদের মতো; ওদের বলা যেতে পারে গ্রীকদের জ্ঞাতি ভাই। আলেকজাণ্ডারের পিতা ফিলিপ ছিলেন মাসিডনের রাজা। তিনি অতি বিচক্ষণ রাজা ছিলেন; তাঁর পরিচালনায় তাঁর ক্ষুদ্র রাজ্যটি ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠল। বিশেষ করে তিনি একটি চমৎকার সেনাদল গড়ে তুলেছিলেন।
আলেকজাণ্ডারকে মহাবীর আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তিনি ইতিহাসেও খুব প্রখ্যাত। কিন্তু তাঁর কৃতিত্বের জন্য তিনি অনেকাংশে পিতার কাছে ঋণী, কারণ ফিলিপই সব-কিছুর সূচনা করে গিয়েছিলেন। যোদ্ধা হিসাবে আলেকজাণ্ডার যত বড়ো ছিলেন, মানুষ হিসাবে ঠিক ততখানি বড়ো ছিলেন কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। অন্তত আমি তো তাঁকে মহামানব বলে মানতে রাজি নই। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তাঁর অল্পদিনের জীবনে তিনি দু-দুটি মহাদেশে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় করে রেখে গিয়েছেন এবং ইতিহাসে যতসব দিগ্বিজয়ী বীরের উল্লেখ রয়েছে তার মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম। সুদূর মধ্য-এশিয়ায় তিনি এখনও সেকেন্দর নামে বিখ্যাত। মানুষ হিসাবে তিনি যা-ই হোন না কেন, ইতিহাসে তিনি প্রভূত গরিমা লাভ করেছেন। তাঁর নাম অনুসারে বহু নগর-নগরীর নাম হয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলি আজ পর্যন্তও বেঁচে আছে। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহর তার মধ্যে সর্ব প্রধান।
মাত্র বিশ বৎসর বয়সে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। গোড়া থেকেই তাঁকে খ্যাতির নেশায় পেয়ে বসেছিল। সবুর আর সয় না। পিতা যে চমৎকার সৈন্যদলটি গড়ে তুলেছিলেন, স্থির হল, তাই নিয়ে তাদের পরোনো শত্রু পারশ্য দেশের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবেন। গ্রীকরা কিন্তু মনে মনে ফিলিপ কিংবা আলেকজাণ্ডার কাউকেই পছন্দ করত না। তা হলেও তাদের ক্ষমতার দাপটে ওরা ভয়ে মাথা নোয়াতে বাধ্য হল। একটি-একটি করে গ্রীক রাষ্ট্রগুলি ওদের আধিপতা স্বীকার করে নিল এবং পারশ্য-অভিযানকারী সম্মিলিত গ্রীক সেনাদলের প্রধান সেনাপতি হলেন আলেকজাণ্ডার। কিন্তু থিব্স্-নামক গ্রীক নগরীটি তাঁর বশ্যতা স্বীকার না করে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে আলেকজাণ্ডার থিব্স্ নগরী আক্রমণ করলেন; সেই প্রচণ্ড আক্রমণে সুপ্রসিদ্ধ নগরীটি একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বহু অধিবাসীকে তিনি নৃশংসভাবে হত্যা করেন এবং বহু সহস্র লোককে তিনি ক্রীতদাসরূপে বিক্রয় করেন। তাঁর এই বর্বরোচিত ব্যবহারে সমস্ত গ্রীস দেশে ত্রাসের সঞ্চার হয়েছিল। অবশ্য এইসব বর্বরজনোচিত ব্যবহারের জন্য তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার উদ্রেক হয় না, বরং দারুণ বিতৃষ্ণা জন্মায়।