বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৬২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৪৪
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

 মিশর তখন ছিল পারশ্যরাজের অধীন। আলেকজাণ্ডার সহজেই মিশর জয় করলেন। জেরিক্সিসের পরবর্তী রাজা পারশ্যসম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসকে তিনি ইতিপূর্বেই যুদ্ধে পরাভূত করেছিলেন। মিশর-জয়ের পরে তিনি পুনরায় পারশ্য অভিমুখে অগ্রসর হন এবং দারিয়ুসকে দ্বিতীয়বার যুদ্ধে পরাজিত করেন। সম্রাট দারিয়ুসের প্রাসাদ আলেকজাণ্ডার সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে দেন। তিনি বলেছিলেন, জেরিক্সিস যে এথেন্স ধ্বংস করেছিলেন এটি তারই প্রতিশোধ।

 পারশ্যভাষায় একখানি অতি প্রাচীন গ্রন্থ আছে। প্রায় হাজার বৎসর পূর্বে ফির্‌দৌশি নামে এক কবি এটি রচনা করেন। এই গ্রন্থের নাম শাহ্‌নামা, এটি পারশ্যরাজাদের ইতিবৃত্ত। এর মধ্যে আলেকজাণ্ডার এবং দারিয়ুসের যুদ্ধ-কাহিনীর বর্ণনা আছে, তার কিছুটা বোধকরি অতিরঞ্জিত। এই গ্রন্থে এরূপ উল্লেখ আছে যে, দারিয়ুস যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ভারতবর্ষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ফুর্ বা পুরু নামে এক রাজা ছিলেন। উষ্ট্রপিষ্ঠে বায়ুবেগে তাঁর কাছে দূত প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু পুরু তাঁকে কোনো সাহায্য করতে সমর্থ হন নি। অল্পকালের মধ্যেই তাঁকেও আলেকজাণ্ডারের বিজয়ী সেনাদলের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফির্‌দৌশির শাহ্‌নামা গ্রন্থে বহু স্থানে উল্লেখ আছে যে, তখনকার কালে পারশ্যের রাজা এবং আমির-ওমরাহরা ভারতবর্ষে-নির্মিত তরবারি, ছোরা ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। এর থেকে প্রমাণ হয় যে, সেই আলেকজাণ্ডারের সময়েও ভারতবর্ষে অতি উঁচুদরের ইস্পাতের অস্ত্রশস্ত্র নির্মিত হত এবং দেশবিদেশে সেসব জিনিসের সমাদরও ছিল।

 পারশ্য থেকে আলেকজাণ্ডার বরাবর অগ্রসর হতে লাগলেন। বর্তমানে হিরাট, কাবুল, সমরকন্দ্ প্রভৃতি শহর যেখানে অবস্থিত সেই অঞ্চলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে ক্রমে তিনি সিন্ধু নদের উপত্যকাভূমিতে উপস্থিত হলেন। এইখানে সর্বপ্রথম ভারতীয় এক রাজা তাঁর অগ্রগতিতে বাধা দিলেন। গ্রীক ঐতিহাসিকরা তাঁদের উচ্চারণ অনুযায়ী তাঁর নাম দিয়েছেন পোরাস। তাঁর আসল নামটা বোধকরি এরই কাছাকাছি একটা-কিছু হবে, সেটা আমরা সঠিক জানি না। উল্লেখ আছে যে, পোরাস পরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং তাঁকে পরাজিত করতে আলেকজাণ্ডারকে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছিল। পোরাস যেমন বীর ছিলেন, তেমনি বলিষ্ঠ ছিল তাঁর চেহারা। আলেকজাণ্ডার তাঁর বীরত্বে এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, যুদ্ধে পরাজিত করেও তিনি তাঁকে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তা হলেও বুঝতে হবে যে, যিনি আগে ছিলেন স্বাধীন নৃপতি, এখন তিনি হলেন গ্রীকদের অধীনস্থ শাসনকর্তা মাত্র।

 উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে খাইবার গিরিপথ দিয়ে আলেকজাণ্ডার ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিলেন এবং রাওয়ালপিণ্ডির উত্তরে অবস্থিত তক্ষশীলা হয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রাচীন তক্ষশীলার ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখতে পাবে। পোরাসকে পরাজিত করে আলেকজাণ্ডার দক্ষিণাভিমুখে গঙ্গাতীর পর্যন্ত অগ্রসর হবার সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অভিপ্রায় সিদ্ধ হল না, সিন্ধু নদের উপত্যকা থেকেই তাঁকে ফিরতে হয়েছিল। আলেকজাণ্ডার সত্যি সত্যি যদি হিন্দুস্থানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেন তা হলে ব্যাপারটা কীরকম দাঁড়াত সেটা একবার ভেবে দেখতে ইচ্ছে করে। সেখানেও কি তিনি জয়লাভ করতেন না ভারতীয় সৈন্যদলের কাছে তাঁকে পরাজয় স্বীকার করতে হত? পোরাসের ন্যায় সীমান্তবাসী এক রাজাকে দমন করতেই তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, সুতরাং মধ্য-ভারতের বড়ো বড়ো রাজশক্তির পক্ষে আলেকজাণ্ডারকে বাধা দেওয়া বোধকরি অসম্ভব হত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলেকজাণ্ডারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরে ব্যাপারটা নির্ভর করে নি, তাঁর সৈন্যদলের সিদ্ধান্ত তাঁকে মেনে নিতে হয়েছিল। বহু বৎসরের অভিযানের ফলে তাঁর সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এমনও হতে পারে, ভারতীয় সৈন্যদের যুদ্ধকৌশল দেখে তারা একটু দমে গিয়েছিল, বুদ্ধিমানের মতো পরাজয়ের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যাওয়াই তারা উচিত মনে করেছিল। যে কারণেই হোক, তাঁর সৈন্যদল আর অগ্রসর হতে রাজি হয় নি। শেষ পর্যন্ত আলেকজাণ্ডারকে তাই মেনে নিতে হল। কিন্তু ফেরবার পথে এদের বিষম বিপদে পড়তে হয়েছিল; খাদ্য এবং পানীয়ের অভাবে সৈন্যদের অশেষ দুর্গতি ভোগ করতে হল। এর অল্পকাল পরেই খৃষ্টপূর্ব ৩২৩