অব্দে বাবিলন শহরে আলেকজাণ্ডারের মৃত্যু হয়। সেই যে কবে পারশ্য অভিযানে বেরিয়েছিলেন, তার পরে আর আপন দেশ মাসিডনে তাঁর ফিরে যাওয়া হল না।
মাত্র তেত্রিশ বৎসর বয়সে আলেকজাণ্ডারের মৃত্যু হল। তিনি ইতিহাসবিখ্যাত ব্যক্তি, কিন্তু তাঁর স্বল্পস্থায়ী জীবনে তিনি কী করে গেলেন? কয়েকটি বড়ো বড়ো যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন, এই পর্যন্ত। তিনি যে একজন বড়ো যোদ্ধা ছিলেন এ বিষয়ে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি অহংকারী, উদ্ধত এবং নৃশংস প্রকৃতির লোক ছিলেন, মনে মনে তিনি নিজেকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছিলেন। কখনও রাগের মাথায়, কখনও-বা খেয়ালের বশে তিনি তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুদেরও হত্যা করেছেন, আবার কখনও সমস্ত অধিবাসী সমেত বড়ো বড়ো নগরী তিনি ধ্বংস করে দিয়েছেন। বিরাট এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন অথচ তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা গেল, তাতে স্থায়ী কিছুই রেখে যান নি—এমনকি ভালো রাস্তাঘাট পর্যন্ত নয়। আকাশের উল্কার ন্যায় তিনি অকস্মাৎ দেখা দিলেন এবং উল্কার মতোই অন্তর্হিত হলেন। পশ্চাতে তাঁর নামের স্মৃতিটুকু ছাড়া আর কিছুই রেখে গেলেন না। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারস্থ ব্যক্তিরা একে অন্যকে হত্যা করতে লাগল এবং অল্পকালের মধ্যেই তাঁর বিরাট সাম্রাজ্য শতধাবিভক্ত হয়ে গেল। তাঁকে বলা হয়েছে জগজ্জয়ী বীর। গল্প আছে একবার তিনি নাকি এই বলে কান্না জুড়ে দিয়েছিলেন যে, জয় করবার মতো দেশ আর একটিও বাকি নেই। কিন্তু আমরা দেখেছি যে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে সামান্য একট অংশ ছাড়া গোটা ভারতবর্ষটাই তাঁর জয় করতে বাকি ছিল। এ ছাড়া সেই যুগেও চীন দেশ এক বিরাট রাজ্য ছিল, আলেকজাণ্ডার তো চীন দেশের ধারে-কাছেও গিয়ে পৌঁছতে পারেন নি।
তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সেনাপতিরাই এতবড়ো সাম্রাজ্যটিকে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়ে নিল। মিশর দেশ পড়েছিল টলেমির ভাগে। সেখানে তিনি বেশ একটি শক্তিশালী রাজ্য স্থাপন করেন। বহুদিন ধরে তাঁর বংশধরেরা সেখানে রাজত্ব করেছিল এবং এদের অধীনে মিশর একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। আলেকজান্দ্রিয়া ছিল তখন মিশরের রাজধানী। সে আমলে আলেকজান্দ্রিয়া নগরী জ্ঞানে বিজ্ঞানে দর্শনে খুবই খ্যাতি অর্জন করেছিল।
পারশ্য, মেসোপটেমিয়া এবং এশিয়া মাইনরের কতক অংশ পড়েছিল সেলিউকস-নামক অপর একজন সেনাপতির ভাগে। ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে যে অংশটুকু আলেকজাণ্ডার জয় করেছিলেন সেটুকু সেলিউকসের ভাগেই পড়েছিল। কিন্তু ভারতের সেই অধিকৃত অংশটুকু তিনি রক্ষা করতে পারেন নি। আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পরেই গ্রীক সৈন্যদের সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়।
খৃষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজাণ্ডার ভারতে আগমন করেন। তাঁর আগমনটা নিতান্তই একটা আকস্মিক আক্রমণের মতো, তা ভারতবর্ষের উপর কোনোই স্থায়ী ফল রেখে যায় নি। অবশ্য কোনো কোনো লোকের ধারণা, এই আক্রমণের পর থেকেই গ্রীস এবং ভারতীয়দের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়। কিন্তু আসলে তা নয়। আলেকজাণ্ডারেরও আগে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল এবং পারশ্য, এমনকি গ্রীস দেশের সঙ্গেও, ভারতের নিয়মিত ব্যবসাবাণিজ্য চলত। অবশ্য আলেকজাণ্ডারের আগমনে এই যোগাযোগ নিশ্চয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ভারতীয় এবং গ্রীস সংস্কৃতির পরিপূর্ণ মিলন ঘটেছিল। এমনকি ‘ইণ্ডিয়া’ শব্দটিও সিন্ধুনদের গ্রীক উচ্চারণ ‘ইনডাস’ থেকে উদ্ভূত।
আলেকজাণ্ডারের আক্রমণ এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ভারতবর্ষে একটি বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, তার নাম মৌর্য সাম্রাজ্য। ভারতের ইতিহাসে এটি একটি গৌরবময় যুগ। এই যুগটি সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা প্রয়োজন।