১৮
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং অর্থশাস্ত্র
২৫শে জানুয়ারি, ১৯৩১
আগের এক চিঠিতে মগধের কথা উল্লেখ করেছি। আজকাল যেখানটায় বিহার প্রদেশ সেইখানে এই প্রাচীন রাজ্যটি অবস্থিত ছিল। এর রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র, বর্তমানে পাটনা নামে খ্যাত। যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে নন্দবংশ বলে একটি রাজবংশ মগধে রাজত্ব করত। আলেকজাণ্ডার যখন ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত আক্রমণ করেন তখন নন্দবংশেরই কোনো রাজা পাটলিপুত্রে রাজত্ব করছিলেন। সেখানে চন্দ্রগুপ্ত নামে একজন যুবক বাস করতেন, তিনি বোধ করি ঐ রাজারই কোনো আত্মীয় হবেন। চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন অতিশয় চতুর, উদ্যোগী এবং উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি। তাঁর তীক্ষ বুদ্ধির ভয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে বিরূপ হয়ে রাজা তাঁকে রাজ্য থেকে বহিষ্কৃত করেন। ইতিমধ্যে আলেকজাণ্ডার এবং গ্রীকদের নানাবিধ গল্প শুনে চন্দ্রগুপ্ত বোধহয় আকৃষ্ট হয়েছিলেন। রাজ্য ছেড়ে তিনি তক্ষশীলায় গমন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক বিচক্ষণ ব্রাহ্মণ নাম বিষ্ণুগুপ্ত অথবা চাণক্য। চন্দ্রগুপ্ত এবং চাণক্য দুজনের কেউই নেহাত শান্তশিষ্ট ভালোমানুষটি ছিলেন না। অদৃষ্টে যা ঘটবে তাই মেনে নেবার পাত্র তাঁরা নন। মাথায় তাঁদের বড়ো বড়ো সব মতলব, আর সেসব মতলব হাঁসিল না করে তাঁরা ছাড়বেন না। আলেকজাণ্ডারের গুণগরিমা দেখে নিশ্চয় চন্দ্রগুপ্তের চোখে ধাঁধা লেগেছিল। মনে মনে ইচ্ছা, তিনিও আলেকজাণ্ডারের মতো হন। এ বিষয়ে চাণক্য হলেন তাঁর প্রধান সহায় এবং মন্ত্রণাদাতা। দুজনেই খুব সচকিত হয়ে তক্ষশীলায় অবস্থান করছিলেন এবং যা-কিছু ঘটছিল তাই মনোনিবেশপূর্বক লক্ষ্য করছিলেন। এখন একবার সুযোগ পেলেই হয়।
সুযোগ আসতে বিলম্ব হল না। আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুসংবাদ যখন এসে তক্ষশীলায় পৌঁছল চন্দ্রগুপ্ত ভাবলেন, এবার কাজের সময় এসেছে। আলেকজাণ্ডার একটি গ্রীক সৈন্যদল এ দেশে রেখে গিয়েছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত চারদিকের লোককে এদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুললেন এবং তাদের সাহায্যে গ্রীক সৈন্যকে আক্রমণ করে দেশ থেকে বিতাড়িত করলেন। তক্ষশীলা অধিকার করে চন্দ্রগুপ্ত সঙ্গীদের নিয়ে পাটলিপুত্র-অভিমুখে যাত্রা করলেন এবং নন্দবংশের সেই রাজাকে যুদ্ধে পরাস্ত করলেন। আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে খৃষ্টপূর্ব ৩২১ অব্দে এই যুদ্ধ হয়। সেই থেকে মৌর্যবংশের রাজত্ব আরম্ভ হল। চন্দ্রগুপ্তকে কেন মৌর্য বলা হয়েছে তার কারণটা খুব সুস্পষ্ট নয়। কেউ কেউ বলে তাঁর মায়ের নাম ছিল মুরা, সেইজন্যই ঐ নাম হয়েছে। আবার অন্যেরা বলে, তাঁর মায়ের বাবা ছিলেন রাজার ময়ূর-রক্ষক—ময়ূর থেকেই ঐ নামের উৎপত্তি। যাক গে, কথাটা যেখান থেকেই আসুক, ‘চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য’ নামেই তিনি পরিচিত। বেশ কয়েক শো বছর পরে চন্দ্রগুপ্ত নামে আর-একজন বড়ো রাজা ভারতবর্ষে রাজত্ব করেছিলেন। এই দুইজন সম্বন্ধে পাছে কোনো ভ্রান্তি জন্মে এইজন্যে বিশেষ করে এঁকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বলা হয়।
মহাভারত এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থ এবং কাহিনীতে আমরা বড়ো বড়ো সব রাজচক্রবর্তীদের কথা শুনেছি। তাঁরা একেবারে অখণ্ড ভারতের অধিপতি ছিলেন, কিন্তু সে প্রাচীন কালের সম্বন্ধে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। সেই সময়ে ভারতবর্ষ কতদূর বিস্তৃত ছিল তাও আমরা ঠিক জানি নে। এমনও হতে পারে, এইসব প্রাচীন কাহিনীতে তখনকার দিনের রাজাদের পরাক্রমের কথা অনেকখানি বাড়িয়ে বলা হয়েছে। যাই হোক, শক্তিশালী এবং বিস্তৃত সাম্রাজ্য বলতে ভারতের ইতিহাসে এই চন্দ্রগুপ্তে মৌর্যের সাম্রাজ্যেরই সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের বেশ একটি উন্নত এবং শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা ছিল। এ কথা ঠিক যে, এরূপ একটি রাষ্ট্র এবং শাসনব্যবস্থা হঠাৎ কেউ সৃষ্টি করতে পারে না। নিশ্চয় বহু কাল ধরে কতকগুলো ধারা চলে আসছিল যার ফলে