বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৬৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং অর্থশাস্ত্র
৪৭

ছোটো ছোটো রাজ্যগুলো ক্রমে একত্রিত হয়েছিল এবং শাসনব্যবস্থাও ক্রমেই উন্নততর প্রণালীতে অগ্রসর হচ্ছিল।

 এশিয়া-মাইনর থেকে ভারতবর্ষ অবধি আলেকজাণ্ডারের বিজিত দেশগুলি পড়েছিল তাঁর সেনাপতি সেলিউকসের ভাগে। চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে সেলিউকস সিন্ধু নদ অতিক্রম করে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। কিন্তু তাঁর হঠকারিতার দরুন তাঁকে পরে অনুতাপ করতে হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। যে পথে এসেছিলেন সেই পথেই আবার তাঁকে ফিরে যেতে হল। লাভ তো কিছু হলই না, মাঝখান থেকে গান্ধার অর্থাৎ আফগানিস্থানের বেশ কতকটা অংশ, একেবারে কাবুল এবং হিরাট পর্যন্ত, চন্দ্রগুপ্তের হাতে ছেড়ে দিতে হল। আর সেলিউকসের কন্যার সঙ্গে হল চন্দ্রগুপ্তের বিবাহ। চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য এখন আফগানিস্থানের কতক অংশ-সহ সমগ্র উত্তর ভারতে বিস্তৃত হল—একেবারে কাবুল থেকে বাংলাদেশ এবং আরবসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর অবধি। কেবলমাত্র দক্ষিণ ভারত তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল না। এই বিরাট সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র।

 সেলিউকস চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় একজন দূত পাঠিয়েছিলেন। তাঁর নাম মেগাস্থিনিস। মেগাস্থিনিস তখনকার দিনের একটি অতি চিত্তাকর্ষক বিবরণ রেখে গিয়েছেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্তের রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্বন্ধে এর চেয়ে মনোরম এবং পূর্ণতর একটি বিবরণ আমরা পেয়েছি। এটির নাম ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’। এই কৌটিল্য আর কেউ নন, আমাদেরই পূর্বপরিচিত চাণক্য বা বিষ্ণুগুপ্ত। আর অর্থশাস্ত্র হচ্ছে ধনসম্পদের মূল নীতিকথা।

 এই ‘অর্থশাস্ত্র’ এক বিচিত্র গ্রন্থ; এর মধ্যে এতসব বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে যে এর সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। রাজার কর্তব্য, মন্ত্রী এবং পারিষদবর্গের কর্তব্যের কথা তো আছেই, তা ছাড়া মন্ত্রণাসভা, শাসনযন্ত্রের বিভিন্ন বিভাগ, ব্যবসাবাণিজ্য, নগর এবং গ্রামসমূহের শাসনব্যবস্থা, আইন-আদালত, সামাজিক রীতিনীতি, নারীর অধিকার, বৃদ্ধ এবং অক্ষমের প্রতিপালন, বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদ, শুল্কনীতি, সেনাদল এবং নৌবহর, যুদ্ধ ও শান্তি, কূটনীতি, কৃষিব্যবস্থা, বয়নশিল্প, শিল্পজীবীদের সমস্যা, ছাড়পত্র, কারাগার, ইত্যাদি সব বিষয়েরই আলোচনা আছে। আরও কত বলব! কৌটিল্যের গ্রন্থের সবগুলি পরিচ্ছেদের নাম করতে গেলে এই চিঠি তাইতেই ভর্তি হয়ে যাবে।

 রাজ্যাভিষেকের সময় প্রজারাই রাজার হস্তে রাজ্যভার অর্পণ করত এবং রাজাকে এই শপথ গ্রহণ করতে হত যে, তিনি প্রজাদের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করবেন। তাঁকে সর্বসমক্ষে এই প্রতিজ্ঞা করতে হত: “যদি কোনো কারণে তোমাদের উপরে কোনো অত্যাচার করি তবে ভগবান যেন আমাকে ইহকাল পরকালের সুখ এবং সন্তান- সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করেন।” ঐ গ্রন্থে রাজার প্রাত্যহিক কর্তব্য এবং কর্মসূচী দেওয়া হয়েছে। জরুরি কার্যাদির জন্য তাঁকে সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকতে হত, কারণ প্রজাসাধারণের কাজ রাজার খোশখেয়ালের দ্বারা বিলম্বিত হতে পারে না। রাজা নিজে যদি কাজে তৎপর হন তা হলে প্রজারাও তৎপর হবে। প্রজার সুখে রাজার সুখ, প্রজার কল্যাণে রাজার কল্যাণ। যাতে কেবলমাত্র নিজের সুখবৃদ্ধি হয় তাকেই রাজা অন্যায় বলে জানবেন, আর যাতে প্রজাসাধারণের সুখবৃদ্ধি হয় তাকেই তিনি সত্যিকারের কল্যাণ বলে মেনে নেবেন।—পৃথিবী থেকে রাজার দল ক্রমে লোপ পেয়ে যাচ্ছে। খুব অল্পই অবশিষ্ট আছে এবং এদেরও যেতে আর বিলম্ব নেই। কিন্তু এটি লক্ষ্য করবার বিষয় যে, প্রাচীন ভারতে রাজা-অর্থে বোঝাত—প্রজার সেবক। রাজাদের ঈশ্বর-দত্ত অধিকার ব’লে কিছু ছিল না, স্বৈরাচারের প্রশ্নই উঠত না। রাজা কোনোরকম অনাচার করলে প্রজারা তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে আর একজনকে তাঁর জায়গায় বসাত। রাজা এবং রাজত্ব সম্বন্ধে এই ছিল তাদের ধারণা। অবশ্য এমন অনেক রাজা ছিলেন যাঁরা এই আদর্শানুযায়ী চলতেন না। তাঁদের মূর্খতার ফলে দেশের এবং দশের অশেষ দুর্গতি হত।

 ‘অর্থশাস্ত্র’-গ্রন্থে আর-একটি নীতির উপরে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে—আর্যজাতীয় কোনো ব্যক্তিকে কখনও ক্রীতদাস হিসাবে ব্যবহার করা হবে না। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, দেশী