হোক বিদেশী হোক, ক্রীতদাসের চলন তখন ছিল। কিন্তু আর্যজাতীয়েরা যাতে ক্রীতদাসরূপে ব্যবহৃত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হত।
মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র—গঙ্গাতীরে নয়-মাইল-ব্যাপী অতি সুদৃশ্য নগরী। নগরীর চারদিক ঘিরে চৌষট্টিটি বিরাট সিংহদ্বার ছিল, এ ছাড়া আরও কয়েক শত ছোটো ছোটো প্রবেশদ্বার ছিল। বাড়িঘর বেশির ভাগ ছিল কাঠের তৈরি। আগুন লাগবার আশঙ্কা ছিল বলে সে বিষয়ে সবিশেষ সতর্ক ব্যবস্থা ছিল। প্রধান প্রধান রাস্তায় হাজার হাজার জলপাত্র সারাক্ষণ জলে ভর্তি করে রাখা হত। প্রত্যেক গৃহস্থের উপর বাড়িতে জলপাত্র রাখবার হুকুম ছিল। তা ছাড়া মই, আঁকশি প্রভৃতি অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিযও রাখতে হত।
কৌটিল্যের গ্রন্থে নগরবাসীদের জন্য একটি নীতির উল্লেখ আছে, সেটি তোমার খুব ভালো লাগবে। রাস্তায় কেউ আবর্জনা ফেললে তাকে জরিমানা দিতে হত। কারও বাড়ির সুমুখে রাস্তায় জলকাদা জমে থাকলে তাকেও জরিমানা করা হত। পাটলিপুত্র এবং অন্যান্য নগরের লোকেরা যদি সত্যি সত্যি এসব নিয়ম মেনে চলে থাকে তবে তো বলতে হবে, ওগুলো অতি সুন্দর তক্তকে ঝক্ঝকে স্বাস্থ্যকর শহর ছিল। আমাদের পৌরসভাগুলো এইসব আইন-কানুন প্রবর্তন করলে আমি খুশি হতাম।
নগর পরিচালনার জন্য পাটলিপুত্রে একটি পৌরসভা ছিল। নাগরিকরাই এই পৌরসভার সদস্য নির্বাচন করত। এঁরা সংখ্যায় ছিলেন ত্রিশজন। পাঁচজন করে সভ্য নিয়ে ছ’টি আলাদা সমিতি গঠন করা হত। তাদের কোনোটির উপর ভার ছিল ব্যবসাবাণিজ্যের কোনোটির উপর কুটিরশিল্পের। কোনো সমিতি পথিক এবং তীর্থযাত্রীদের সুবিধার ব্যবস্থা করত, কোনোটি বা ট্যাক্স-নির্ধারণের জন্য জন্ম-মৃত্যুর হিসেব রাখত, আবার কোনোটি বা পণ্যোৎপাদনের ব্যবস্থা করত। আর সমগ্র পৌরসভার উপর ছিল নগরের স্বাস্থ্য, আয়ব্যয়, জল-সরবরাহের ভার এবং প্রমোদ-উদ্যান ও সরকারি গৃহাদির রক্ষণাবেক্ষণের ভার।
বিচার আচার এবং মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য পঞ্চায়েত প্রথা ছিল। দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সাহায্যের জন্য বিশেষ বিধিব্যবস্থা করা হয়েছিল। সরকারি গোলাঘরগুলিতে অর্ধেক শস্য দুর্ভিক্ষের জন্য আলাদা করে রাখা হত।
বাইশ শো বছর পূর্বে চন্দ্রগুপ্তে এবং চাণক্য মিলে যে মৌর্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন এই ছিল তার রূপ। কৌটিল্য এবং মেগাস্থিনিস যেসব কথা বলে গেছেন তারই কিছু কিছু এখানে উল্লেখ করলাম। তখনকার দিনে উত্তর ভারতের অবস্থা কীরূপ ছিল এইটুকু থেকেই তার মোটামুটি ধারণা করতে পারবে। রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে শুরু করে সাম্রাজ্যের সহস্র সহস্র নগর শহর গ্রাম নিশ্চয় জীবনের আনন্দে মুখরিত হয়েছিল। সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চলে গিয়েছে বড়ো বড়ো সব রাস্তা। আর সর্বপ্রধান যে রাজপথ সেটি চলে গিয়েছে পাটলিপুত্রের ভিতর দিয়ে একেবারে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অবধি। রাজ্যের সর্বত্র খাল কাটানো হয়েছিল, সরকারি সেচ-বিভাগ তার দেখাশোনা করত। আর নৌবিভাগের তত্ত্বাবধানে ছিল বন্দর, খেয়া-পারাপার এবং সেতুনির্মাণ-ব্যবস্থা। অসংখ্য নৌকা এবং জাহাজ জলপথে যাতায়াত করত। সমুদ্রগামী জাহাজ সমুদ্র পার হয়ে চীন-ব্রহ্মদেশ অবধি যেত।
চন্দ্রগুপ্ত চব্বিশ-বৎসর-কাল রাজত্ব করেছিলেন। পরের চিঠিতে মৌর্য সম্রাজ্য সম্বন্ধে আরও কিছু বলব। খৃষ্টপূর্ব ২৯৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।