৬ই ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। তাঁর অতিপ্রিয় জাতীয় পতাকায় মৃতদেহটিকে আবৃত করে লক্ষ্ণৌ থেকে আনন্দভবনে তাঁকে নিয়ে এলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই দেহ একমুঠো ভস্মে পরিণত হল এবং মা গঙ্গা সেই অতি মূল্যবান দেহাবশেষ সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন।
লক্ষ লক্ষ লোক তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করেছে, কিন্তু এই যে আমরা যারা তাঁর সন্তান, তাঁর রক্তমাংসে গড়া মানুষ—তাদের মনের অবস্থা কে বুঝবে? আর এই-যে আনন্দভবন, তার অবস্থাই বা কী? এটিও তো আমাদের মতোই তাঁর সন্তান। নিজের হাতে কত যত্নে কত ভালোবেসে একে গড়ে তুলেছিলেন। আজ সেই গৃহ জনহীন, পরিত্যক্ত; তার প্রাণশক্তি অন্তর্হিত। বারান্দায় মৃদু পদক্ষেপে অতিসন্তর্পণে আমরা হাঁটি চলি, পাছে যিনি এই সুখের নীড় গড়েছিলেন তাঁর শান্তির ব্যাঘাত হয়।
আমরা তাঁর জন্য শোকার্ত, প্রতি মুহূর্তে তাঁর অভাব বোধ করছি। এই-যে দিন যাচ্ছে, কই, শোকের তাপ তো একতিল কমছে না? তাঁর অভাব তেমনি অসহ্য মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি এটি চান নি; চান নি যে শোকে আমরা ভেঙে পড়ি। তিনি যেভাবে দুঃখের সম্মুখীন হয়েছেন এবং দুঃখকে জয় করেছেন আমরাও তাই করি, এই তিনি চেয়েছিলেন। তিনি যে কাজ অসমাপ্ত রেখে গেছেন আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে তাই করে গেলে তবেই তিনি তৃপ্তি পাবেন। চুপ করে বসে বৃথা আমাদের শোক করবার সময় কোথায়? কাজ যে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-যজ্ঞে আমাদের আহ্বান এসেছে। সেই যজ্ঞেই তিনি প্রাণ আহুতি দিয়েছেন। তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা বেঁচে থাকব, প্রাণপণে সংগ্রাম করব, প্রয়োজন হয় তো প্রাণ দেব।
বসে বসে তোমাকে চিঠি লিখছি, সুমুখে যতদূর দেখা যায় আরবসাগরের নীল জলরাশি, অপরদিকে বহুদূরে ভারতের তটসীমা ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই সীমাহীন অনন্ত বিস্তার দেখে কেবলই মনে পড়ছে, উঁচু দেয়াল-ঘেরা নাইনি জেলের ছোট্ট ব্যারাকটি, যেখান থেকে তোমাকে আগের সব চিঠি লিখেছি। সুমুখে দিকচক্রবাল-রেখাটি সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—যেখানে আকাশ এবং সমুদ্র যেন মিশে গেছে। কিন্তু জেলখানার বন্দীর চোখে চারদিক ঘেরা উঁচু দেয়ালটাই দিগন্তরেখা টেনে দেয়। বন্দীদের মধ্যে আমরা অনেকে আজ কারাপ্রাচীরের বাইরে আছি, বাইরের মুক্ত হাওয়া উপভোগ করছি। কিন্তু আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে আজও সংকীর্ণ কারাকক্ষে আবদ্ধ; সেখানে তারা না দেখে সমুদ্র, না দেখে ডাঙা, না দেখে দূর দিগন্ত। বলতে গেলে ভারতমাতা নিজেই কারারুদ্ধ, তাঁর স্বাধীনতা আজও অনাগত। ভারতবর্ষই যদি স্বাধীন না হল তবে আমাদের এইটুকু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূল্য কোথায়?
২০
আরবসাগর
এস্. এস্. ক্রাকোভিয়া
২২শে এপ্রিল, ১৯৩১
ক্রাকোভিয়া-জাহাজে আমরা বোম্বাই থেকে কলম্বো যাচ্ছি, এই ভেবে কেমন অবাক লাগছে। বেশ মনে পড়ছে—প্রায় চার বছর আগে ভেনিসে এই ক্রাকোভিয়া জাহাজের ভিড়বার প্রতীক্ষার দাঁড়িয়ে আছি। জাহাজে আসছিলেন তোমার দাদু; তোমাকে সুইজারল্যাণ্ডে তোমার ইস্কুলে রেখে আমি গিয়েছি ভেনিস থেকে তাঁকে এগিয়ে আনতে। আবার কয়েক মাস পরে এই ক্রাকোভিয়া-জাহাজেই তিনি ইউরোপ থেকে দেশে ফিরে এলেন, আমি বোম্বাইয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ