বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৬৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ছুটি ও স্বপ্নযাত্রা
৫১

করলাম। সেবারে যাঁরা তাঁর সঙ্গে এক জাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজন এখন আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। এঁরা সারাক্ষণ তাঁর সম্বন্ধেই কথা বলছেন, তাঁরই গল্প করছেন।

 গত তিন মাসের মধ্যে যে কত পরিবর্তন হয়েছে সে কথা কালকে তোমাকে লিখেছি। গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যেসমস্ত ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে একটি ঘটনা বিশেষ করে তোমাকে স্মরণ রাখতে বলছি, কারণ সারা ভারতবর্ষেই এই ঘটনাটি বহুকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ এক মাসও হয় নি, কানপুর শহরে ভারতের একটি অতি বীর সৈনিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর নাম গণেশশঙ্কর বিদ্যার্থী—অপরের প্রাণরক্ষা করতে গিয়ে তিনি নিহত হয়েছেন। গণেশজি আমার পরম বন্ধু ছিলেন। যেমন মহৎপ্রাণ তেমনি নিঃস্বার্থ কর্মী। তাঁর মতো লোকের সঙ্গে একযোগে কাজ করাও গৌরবের কথা। গত মাসে কানপুরের জনতা যখন ক্ষিপ্ত হয়ে একে অন্যকে হত্যা করছিল তখন গণেশজি সেই ক্ষিপ্ত জনতার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আপন দেশবাসীদের সঙ্গে লড়াই করতে যান নি, গিয়েছিলেন তাদের রক্ষা করতে। শত শত লোকের প্রাণরক্ষা করেও ছিলেন, কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি, রক্ষা করবার চেষ্টাও করেন নি। যাদের রক্ষা করতে গিয়েছিলেন তাদের হাতেই তিনি নিহত হলেন। আমাদের প্রদেশ এবং বিশেষ করে কানপুর একটি অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারিয়েছে। আর আমরা হারিয়েছি আমাদের অতিপ্রিয় এবং শুভানুধ্যায়ী সুহৃদকে। কিন্তু ভেবে দেখো, কী গৌরবের মৃত্যু—ধীর, স্থির, দ্বিধাহীনচিত্তে তিনি উন্মত্ত জনতার সম্মুখীন হয়েছেন, চতুর্দিকের হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও নিজের কথা না ভেবে অপরের প্রাণরক্ষার কথাই ভেবেছেন।

 পরিবর্তন-ভরা তিনটি মাস। অসীম কাল-সমুদ্রে এ যেন একটি ফোঁটা, একটা জাতির জীবনে একটি নিমেষ। তিন সপ্তাহ আগে আমি সিন্ধু নদের উপত্যকায় মোহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়েছিলাম। তুমি আমার সঙ্গে ছিলে না। সেখানে দেখলাম, ইষ্টকনির্মিত বড়ো বড়ো পাকা বাড়ি এবং প্রশস্ত রাজপথ-সমেত একটি বিরাট নগরী ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসছে। লোকে বলে, এসব পাঁচ হাজার বছর আগের তৈরি। তা ছাড়া সেই প্রাচীন নগরীতে চমৎকার সব গহনাপত্র এবং কতরকমের মৃৎপাত্র দেখলাম। আমি কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম, সুসজ্জিত নরনারীর দল রাস্তায় সার বেঁধে চলেছে, ছেলেমেয়েরা খেলাধুলো করছে, বাজারে কতরকমের পণ্যদ্রব্য থরে থরে সাজানো, লোকেরা কেনাবেচায় ব্যস্ত, ওদিকে মন্দিরে মন্দিরে পূজারতির ঘণ্টা বাজছে।

 এই পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষে একটি জীবনধারা নিরন্তর বয়ে চলেছে, কত পরিবর্তন তার জীবনে ঘটেছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কী জানো, আমাদের এই বৃদ্ধা ভারতমাতা—অবশ্য তিনি প্রাচীনা হলেও অনন্তযৌবনা এবং অসামান্যা রূপসী—ইনি তাঁর সন্তানদের অধৈর্য এবং অস্থিরতা দেখে বোধকরি মনে মনে হাসেন, কারণ, মানষের সুখ দুঃখ অভাব অভিযোগ নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, দিবসান্তে কোথায় মিলিয়ে যায়।


২১

ছুটি ও স্বপ্নযাত্রা

২৬শে মার্চ, ১৯৩২

 অতীতের ইতিহাস সম্বন্ধে নাইনি জেল থেকে তোমাকে লেখার পর চোদ্দটি মাস কেটে গেছে। তার তিন মাস পরে আবার আরবসাগর থেকে আরও দুখানা ছোট্ট চিঠি লিখেছিলাম। তখন আমরা ক্রাকোভিয়া-জাহাজে চড়ে যাত্রা করেছি লঙ্কার দিকে। আমি লিখতাম, আর আমার সামনে থাকত বিশাল সমুদ্র—আমার ক্ষুধাতুর চোখদুটো তাকে দেখে দেখে আর আশ মেটাতে পারত না।