প রি চি তি
১৯৩০ সনের অক্টোবর হইতে ১৯৩৩ সনের আগস্ট, এই তিন বৎসরের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে GLIMPSES OF WORLD HISTORY (বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ) লিখিত হইয়াছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং ভারতে বৃটিশ-শাসনের প্রতিরোধ করিবার অপরাধে গ্রন্থকার তখন কারাজীবন যাপন করিতেছিলেন।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁহার এই অবশ্য বিশ্রামের—তাঁহার নিজের ভাষায়, ‘অবকাশ ও নির্লিপ্তির’,—সুযোগ গ্রহণ করেন এবং বিশ্ব-ইতিহাস সম্পর্কে লিখিতে আরম্ভ করেন। তাঁহার বালিকা কন্যার উদ্দেশ্যে লিখিত পত্রাকারে তিনি ইহা রচনা করিয়াছিলেন, কারণ প্রায়ই কারাগারে রুদ্ধ থাকার ফলে এই কন্যার শিক্ষার তত্ত্বাবধান করার কোন সুযোগ তাঁহার ছিল না।
১৯৩৪ সনের ১২ই ফেব্রুয়ারী তারিখে পুনরায় ধৃত হইয়া ‘রাজদ্রোহে’র’ অপরাধে দুই বৎসর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবার পূর্বে পণ্ডিত নেহরু যখন অত্যল্পকালের জন্য অবকাশ পাইয়াছিলেন, তখন তিনি এই পত্রগুলি একত্রিত করেন। অতঃপর ১৯৩৪ সনে তাঁহার ভগ্নী মাননীয়া শ্রীমতী বিজয়লক্ষী পণ্ডিত * * * এই পত্রগুলিকে GLIMPSES OF WORLD HISTORY (বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ) নামে পুস্তকাকারে প্রকাশ করিবার ব্যবস্থা করেন।
নামকরণ যথোপযুক্তই হইয়াছে। পুস্তকের বিষয়বস্তুর পরিচিতির পক্ষে এই নামটির ব্যঞ্জনা যথেষ্ট। * * *
১৯৩৬ সনে মুক্তিলাভের পর পুনরায় পণ্ডিত নেহরু রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিতে থাকেন। ইহার পর কর্মব্যস্ততা, দায়িত্ব এবং দুর্ভাগ্যবশত, পারিবারিক বিয়োগ-বেদনায় তাঁহার আর অবকাশ থাকে না। ভারতেও ঘটনাবলী তীব্রতা ও ত্বরার সহিত অগ্রসর হইতে থাকে। ইউরোপ তথা পৃথিবীতে বিরাট পরিবর্তন ও যুগান্তকারী ঘটনাসমূহ পরিলক্ষিত হয়। পণ্ডিতজী ভাবী সভ্যতার পক্ষে অর্থময় এই সকল ঘটনার দর্শকমাত্র ছিলেন না, সেগুলিতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করিয়াছিলেন। কেন না, পণ্ডিত নেহরু সেই বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জননায়কদের অন্যতম যাঁহাদের মধ্যে উদ্দাম কর্মতৎপরতার সহিত দৃষ্টির প্রসারতা ও নিস্পৃহতার সমন্বয় ঘটিয়াছে। ইউরোপ ভ্রমণকালে পণ্ডিতজী পাশ্চাত্ত্য জগতের কতিপয় সাম্প্রতিক ঘটনা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। তিনি চীন ও স্পেনের সংগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসিয়াছেন।
বর্তমান সংস্করণটিকে অনেকদিক হইতে একখানি নূতন বই বলা চলে, স্বয়ং গ্রন্থকার কর্তৃক ইহা সংশোধিত, বহুল পরিমাণে পুনর্লিখিত এবং ১৩৩৮ সনের শেষ পর্যন্ত ঘটনা সংবলিত করা হইয়াছে। এই কাজগুলি তিনি কারাগারের বাহিরে করিলেও ইহাতে মূল রচনার নৈর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষতা বিন্দুমাত্রও ব্যাহত হয় নাই। বরং ইহা অধিকতর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের অবদানে সমৃদ্ধ হইয়াছে।
GLIMPSES OF WORLD HISTORY (বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ) ঘটনার বিবরণী মাত্র নহে। বিবরণের দিক হইতে উহা যেমন মূল্যবান, তেমনি লেখকের ব্যক্তিত্বের ছাপও উহাতে বর্তমান। তাঁহার অসাধারণ মনীষা ও অনভূতিপ্রবণ মন এই ইতিহাস গ্রন্থকে অনন্যসাধারণ করিয়া তুলিয়াছে। বর্ধিষ্ণু শিশুর উদ্দেশ্যে লিখিত পত্রের আকারও ইহাতে ক্ষুণ্ণ হয় নাই। ইহার আবেদন সরল এবং ঋজু; কিন্তু বিষয়বস্তুর আলোচনা কোথাও অগভীর নহে। ঘটনার বিবৃতি বা তাৎপর্য বিশ্লেষণ কোথাও অতিমাত্রায় সরলীকৃত হয় নাই। * * *