তার পর লঙ্কায় পৌঁছলাম, সেখানে দুঃখকষ্ট ভুলতে চেষ্টা করলাম মহানন্দে ছুটিটা কাটিয়ে। মনোরম সেই দ্বীপটির এ কোণ থেকে ও কোণ পর্যন্ত আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি, প্রকৃতির মাধর্যে ও প্রাচুর্যে মুগ্ধ হয়ে। বিগত মহিমার ভগ্নাবশেষ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাণ্ডী, নুবারাএলিয়া, অনুরাধাপুর। সে সময়ে দেখা জায়গাগুলোর কথা ভাবতে আজ কী সুন্দর লাগে। কিন্তু সেই প্রাণোদ্বেল, শীতল ক্রান্তীয় বনভূমি তার সহস্র চক্ষু দিয়ে তাকিয়ে আছে, এই দৃশ্যটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। সেই সরল, সুন্দর, সরু সুপারিগাছ, অগণ্য তালনারিকেলপরিবৃত সিন্ধুতীর! সেখানে দ্বীপের শ্যামলিমা মিশছে সাগর ও আকাশের নীলিমাতে; সেখানে সমুদ্রের জল ঝিলমিলিয়ে ওঠে, খেলা করে বেলাভূমিতে; আর তালীকুঞ্জের ফাঁকে ফাঁকে বাতাস বয়ে যায় মর্মর-শব্দে।
পৃথিবীর উষ্ণ অঞ্চলে সেই তোমার প্রথম পদার্পণ, আমারও তাই, কিন্তু বহুপূর্বের সেই লুপ্তস্মৃতি পর্যটনে বহু নূতন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা গিয়েছিল। যাবার আগে সেগুলোর প্রতি আমার আসক্তি ছিল না, কারণ উত্তাপকে আমার বড়ো ভয়। সমুদ্র, পাহাড় আর সর্বোপরি সেই উত্তুঙ্গ তুষারস্তূপের নাম শুনেই আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু যাবার পরে আমাদের সেই স্বল্পস্থায়ী সিংহলপ্রবাসেই আমি উষ্ণদেশের মোহিনী মায়া অনুভব করেছিলাম প্রাণে। আবার মিতালি পাতানোর আশায় ব্যগ্র হয়েছিলাম সেখান থেকে ফিরে আসবার সময়।
সিংহলের ছুটি আমাদের ফুরিয়েছিল বড়ো তাড়াতাড়ি, সাগর পাড়ি দিয়ে আমরা আবার ফিরেছিলাম ভারতের দক্ষিণসীমায়। সেই কন্যাকুমারী দর্শন মনে পড়ে, যেখানে বাস করেন আমাদের চিরকুমারী দেবী আর যাকে পাশ্চাত্যবাসীরা স্বীয় প্রতিভাগুণে বিকৃত করে নিয়েছে ‘কেপ কমোরিন’-রূপে। বলতে গেলে তখন আমরা ভারতমাতার চরণতলে বসে দেখেছিলাম, আরবসাগর মিশছে বঙ্গোপসাগরের জলে; কল্পনা করেছিলাম, ভারতবর্ষকে তারা দিচ্ছে তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। কী নিবিড় শান্তি তখন সেখানে, আমার মন উড়ে চলেছিল শতসহস্র ক্রোশ পার হয়ে ভারতের আর-এক সীমায়, চিরতুষারকিরীটী শান্তিধারাস্নাত হিমাচলের দেশে। কিন্তু এ-দুয়ের মধ্য পড়ে রয়েছে কত বিরোধ, কত দুর্দশা, কত দারিদ্র্য!
অন্তরীপ থেকে আমরা যাত্রা করেছিলাম উত্তরদিকে।
ত্রিবাঙ্কুর আর কোচিনের মধ্য দিয়ে, মালাবারের খালের জল কেটে কেটে আমরা চলেছিলাম, কেমন করে চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত বনময় তীরের কোলে কোলে ভেসে চলেছিল আমাদের নৌকো। তার পর একে একে মহীশূর, হায়দ্রাবাদ, বোম্বাই—শেষে এলাহাবাদ! সে নয় মাস আগের কথা—তখন জুন মাস।
কিন্তু আজকাল আগে হোক পরে হোক, ভারতের সব পথেরই গন্তব্যস্থল এক। সত্যেই হোক আর স্বপ্নেই হোক, সকল যাত্রারই অবসান হয় কারাদুর্গের মধ্যে। সুতরাং আমি আবার এখানে ফিরে এসেছি, আমার চারদিকে সেই অতিপরিচিত দেয়াল আর হাতে চিন্তা করবার মতো অথবা তোমাকে চিঠি লেখবার মতো প্রচুর অবসর। আবার সংগ্রাম আরম্ভ হয়েছে, দেশের নরনারী ছেলেমেয়ে সবাই দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করবার সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে সে যুদ্ধে। কিন্তু স্বাধীনতার দেবতা দুর্জয়। প্রাচীন দেবদেবীর মতো তিনি তাঁর পূজারীদের কাছে চান নরবলি।
কারাগারে আজ আমার পুরো তিন মাস কাটল। তিন মাস আগে ঠিক এমনি দিনে—২৬শে ডিসেম্বরে—আমাকে ষষ্ঠবার গ্রেফ্তার করা হয়। বহুদিন পরে আবার তোমাকে চিঠি লিখছি—কিন্তু তুমি তো জানো, বর্তমানেই যখন চিত্ত পরিপূর্ণ, অতীতের কথা চিন্তা করা তখন কত কঠিন। বাইরের ঘটনাতে মনকে আর বিক্ষিপ্ত হতে না দিয়ে কারাগারের মধ্যে গুছিয়ে নিয়ে বসতে কিছু সময় লাগে। এবার থেকে ঠিকমতো তোমার কাছে লিখতে চেষ্টা করব। এখন আমি অন্য একটা কারাগারে। তাতে যা পরিবর্তন হয়েছে তা আমার পছন্দ হচ্ছে না, আর কাজেরও কিছু ব্যাঘাত হচ্ছে। আমার চারদিকের দিগ্বলয় এখানেই সবচেয়ে উঁচু—দেয়ালগুলোর অন্তত উচ্চতার দিক দিয়ে চীনের প্রাচীরের সঙ্গে কিছুটা সম্বন্ধ আছে! উচ্চতায় এগুলো ২৫ ফিটের কাছাকাছি বলেই