বোধ হচ্ছে। আমাদের দেখা দেবার জন্যে এই দেয়াল ডিঙিয়ে আসতে সূর্যদেবের আরও দেড় ঘণ্টা বেশি সময় লাগে।
আমাদের দিক্চক্রবাল কিছুদিনের জনো গণ্ডিবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু যাক গে, তার চেয়ে সেই নীল সাগর, মরু পর্বত, আর দশ মাস আগে তুমি আমি ও তোমার মা যে স্বপ্নযাত্রা করেছিলাম, তাদের কথা চিন্তা করাও ভালো—যদিও এখন আর সেগুলিকে সত্যি বলে মনে হয় না।
২২
মানুষের জীবনসংগ্রাম
২৮শে মার্চ, ১৯৩২
বিশ্বের ইতিহাসের সূত্র ধরে আবার অতীতের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে নিই। সে এক জটিল সূত্র, জট খোলাও কঠিন, আবার তার সম্পূর্ণ আকার দেখতে পাওয়াও সহজ নয়। তার সামান্য এক ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলে তাকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিতেই আমরা সুনিপুণ। আমরা প্রায় সবাই ভাবি যে, আমাদের দেশের ইতিহাস অন্য সকল দেশের চেয়ে মহিমময় ও অনুধাবনযোগ্য। এ সম্বন্ধে একবার তোমাকে সতর্ক করে দিয়েছি, আবার দিচ্ছি, কারণ ঐ ফাঁদে পড়া বড়োই সহজ। এরকম ঘটনা যাতে না ঘটে সেইজন্যেই আমি এসব চিঠি তোমাকে লিখতে শুরু করি, তবুও মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে আমিও সেই একই ভুল করছি। আমার নিজের শিক্ষার মধ্যেই যদি গলদ থাকে, যে ইতিহাস আমি পড়েছিলাম তাই যদি এমন উল্টোপাল্টা হয়, তবে আর কী করা যাবে? সে দোষ আমি কারাগারে নির্জনে আরও পড়াশুনো করে সংশোধন করে নেবার চেষ্টা করেছি, হয়তো সফলও হয়েছি কতকটা। কিন্তু অল্পবয়সে মনের যাদুঘরে যেসব মানুষ ও ঘটনাবলীর ছবি ঝুলিয়েছিলাম আজ আর সেগুলোকে সরাতে পারছি না। আর এইসব ছবিগুলিই ইতিহাস সম্বন্ধে আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে রঙিয়ে রেখেছে, সে দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের অসম্পূর্ণতার জন্য অনেকটা সীমাবদ্ধ। কাজেই লিখতে লিখতে আমি ভুল করব, বহু অপ্রয়োজনীয় ঘটনার উল্লেখ করব এবং প্রয়োজনীয় ঘটনার উল্লেখ করতে ভুলে যাব। কিন্তু এ চিঠিগুলো তো ইতিহাসের পুঁথির জায়গা নেবে বলে লেখা নয়। এরা হচ্ছে, আমাদের মধ্যে বহু কঠিন প্রাচীরমালা আর হাজার মাইল দূরত্বের ব্যবধান না থাকলে দুজনে বসে যে আলোচনা হত, তাই; অন্তত এদের সেইরকম বলে কল্পনা করেই আমি তৃপ্তিলাভ করি।
যেসব প্রসিদ্ধ লোকেদের কথায় ইতিহাসের পাতা পূর্ণ, তাঁদের কথা তোমার কাছে না লিখে আমি পারব না। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেতিহাস বেশ উপভোগ্য, আর তাঁরা যে কালে বাস করতেন সেই কালকে বুঝতে তাঁরা বিশেষ সাহায্য করেন। কিন্তু ইতিহাস তো কেবল বড়ো বড়ো লোক আর রাজামহারাজাদের কীর্তিকলাপ নয়। তাই যদি হত তবে ইতিহাস এতদিনে শেষ হয়ে যেত, কারণ, বিশ্বের নাটমঞ্চের উপর রাজারাজড়াদের ঘোরাফেরার পালা প্রায় থেমে গেছে। কিন্তু যাঁরা সত্যিকারের বড়ো তাঁদের প্রকাশ পেতে সিংহাসন বা রাজমুকুট অথবা মণিরত্ন লাগে না। রাজাদের রাজত্বটুকু বাদে আর কিছুই নেই, তাই ভিতরের নগ্নতাকে লুকিয়ে রাখতেই তাঁদের এত পোশাকপরিচ্ছদ লাগে, আর দুর্ভাগ্যবশত আমাদের অধিকাংশই সেই বাইরের চাকচিক্যে ভুলে যায়। অথচ এরা—
‘সামান্য রাজা ছাড়া আর কিছু নয় যে,
কিরীট দেখেই তারে রাজকীয় কয় যে!’
প্রকৃত ইতিহাস কেবল এখান-সেখান থেকে গুটিকয় ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে আলোচনা করবে না; যারা জাতির সৃষ্টি করে, জীবনের অত্যাবশ্যক এবং বিলাসসম্ভার জোগাতে যাদের পরিশ্রম করতে