হয়, আর যারা শতসহস্রভাবে পরস্পরের উপর প্রভাব বিস্তার করে, সেই জনগণের কথাই থাকবে তাতে। মানুষের এরকম ইতিহাস সত্যিই চমৎকার। মানুষ যুগে যুগে যে সংগ্রাম করে এসেছে প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক উপাদানের বিরুদ্ধে, বন এবং বন্য জন্তুর বিরুদ্ধে, আর স্বার্থ নিয়ে স্বজাতীয় যারা তাকে জয় করতে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে, তারই কাহিনী এ মানুষের জীবনসংগ্রামের কাহিনী। আর যেহেতু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বেঁচে থাকতে হলে খাওয়া পরা থাকার জন্যে কতকগুলো জিনিষ অত্যাবশ্যক, তাই, যাদের এইসব সুবিধা আছে তারাই অন্যের উপর স্বীয় অধিকার বিস্তার করে এসেছে। শাসকদের কর্তৃত্বের ক্ষমতা ছিল, কারণ জীবনযাত্রার পক্ষে প্রয়োজনীয় বস্তুগুলিও তাদের ছিল। তাই তারা অন্যকে উপোস করিয়ে বশে আনবার শক্তিও অর্জন করেছিল। সেইজন্যেই আমরা বারংবার দেখেছি, কেমন করে বহু সংখ্যক জনতা মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোকের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে—এরা বিনা পরিশ্রমে অর্থোপার্জন করে নিচ্ছে, আর তারা পরিশ্রম করেও জীবিকা অর্জন করতে পারছে না।
বর্বর আদিম মানুষ একলা শিকার করতে করতে ধীরে ধীরে এক সংসার গড়ে তোলে। আবার এইরকম বহু সংসার একত্র করে সৃষ্টি হয় গ্রামের, আর বিভিন্ন গ্রামের মজুর, বণিক আর কারিকরেরা মিলে দল বাঁধে। এমনি করে ধীরে ধীরে এক-একটি সমাজ গড়ে আর বেড়ে উঠেছে। সূত্রপাত এর একটি মানুষ, একটি বন্য জীবকে নিয়ে। তখন কোনোরকম সমাজ ছিল না! এর পরে এল সংসার, তার পরে পল্লী, আর কয়েকটি পল্লী নিয়ে একটি গ্রাম। কিন্তু কেন এই সমাজ গড়ে উঠল? জীবনসংগ্রামই তার মূল, কারণ আত্মরক্ষার সময় একলা যুদ্ধ করার চেয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ চালানোই অধিকতর কার্যকরী। তা ছাড়া অন্যান্য কাজেও সহযোগিতার দাম ছিল। একত্র কাজ করে তারা অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি খাদ্য এবং জীবনের অন্যান আবশ্যক জিনিষ জোগাড় করতে পারত। এই সংঘবদ্ধ হওয়ার ফলে বন্য বর্বর শিকারী থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক অর্থনৈতিক গোষ্ঠী বা সমাজ, একটা দলবদ্ধ জীবন। সম্ভবত বিরামহীন-জীবনসংগ্রাম-জাত এই দল থেকেই আবার উদ্ভূত হয়েছিল বৃহত্তর সমাজ। সুদীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে অবিরত দুঃখবিপদের মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, এই বৃদ্ধি ঘুরেফিরে এসেছে। কিন্তু মনে কোরো না যে, এই বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে বা তখনকার চেয়ে এখনকার পৃথিবী আরও আনন্দপূর্ণ। হয়তো আগের চেয়ে কিছু ভালো হয়েছে, কিন্তু তাই বলে সর্বাঙ্গসুন্দর এটা মোটেই হয় নি, চতুর্দিকে রয়েছে প্রভূত দুঃখকষ্ট।
এই অর্থনৈতিক সমাজের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে জীবন জটিলতর হয়ে ওঠে। ব্যবসাবাণিজ্য বাড়ে। দানের পরিবর্তে আরম্ভ হয় বিনিময়, আর অর্থ এসে এই বিনিময়ের জগতে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে যায়। বাণিজ্যের অগ্রগতির পক্ষে এটা অত্যন্ত সুবিধাজনক, কারণ সোনারুপোর মুদ্রা আসাতে বিনিময়ের পথ সরল হয়ে যায়। পরবর্তী যুগে মুদ্রাও সব সময়ে ব্যবহৃত হয় না, তার নিদর্শনেই কাজ চলে যায়। একটুকরো কাগজই হয়ে ওঠে যথেষ্ট। এইভাবে সৃষ্টি হয় ‘ব্যাঙ্ক-নোট’ আর ‘চেক’-এর। এর মানে হচ্ছে, ধারে ব্যবসা চালানো। এই ধারের সুবিধা হল, এটা বাণিজ্যের উন্নতির সহায়। তুমি তো জানো, ‘চেক’ আর ‘ব্যাঙ্ক-নোট’ আজকাল বহুল পরিমাণে চলে, নির্বোধ না হলে কেউ থলিথলি সোনারূপো সঙ্গে নিয়ে বেড়ায় না।
আমরা দেখছি, অস্পষ্ট অতীতের থেকে বেরিয়ে এসে এগিয়ে চলেছে ইতিহাস, মানুষ কৃষিজাত দ্রব্যাদি অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণে উৎপাদন করছে ক্রমে ক্রমে, বিভিন্ন ব্যবসায়ক্ষেত্রে নৈপুণ্য অর্জন করছে, পরস্পরের সঙ্গে দ্রব্যবিনিময় চলছে, আর এইভাবে বিকাশলাভ করছে বাণিজ্য। যানবাহনের ক্রমিক উন্নতিও আমরা দেখছি, বিশেষ করে গত এক শতাব্দী ধরে, বাষ্পযানের অভ্যুদয়ের পর থেকে। উৎপন্ন দ্রব্যাদির বাহুল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের ধনবলও বর্ধিত হচ্ছে, তার ফলে কেউ কেউ পাচ্ছে আরও বিশ্রাম। অতএব যাকে সভ্যতা বলা হয় তারই হচ্ছে বিকাশ।
এইসব ঘটছে, আর মানুষ গর্ব করছে প্রাগ্রসর আলোকপ্রাপ্ত নবযুগের এবং নবীন সভ্যতার, শিক্ষার এবং বিজ্ঞানের বিস্ময়ের। কিন্তু তবুও গরিবেরা গরিব দুঃখীই থাকছে, বিশাল জাতিরা পরস্পরের সঙ্গে হানাহানি করেই মরছে ও লক্ষ লক্ষ মানুষ মারছে, আর আমাদের দেশের মতো