বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৭৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
পরিপ্রেক্ষা
৫৫

বিপুল সব দেশ রয়েছে বিদেশীর শাসননিপীড়িত হয়ে। নিজের সংসারের মধ্যেও যদি স্বাধীন হয়ে না থাকতে পারি তবে কী লাভ সেই সভ্যতায়? তবে কিনা, আমরা এখন কিছু একটা করব বলে দৃঢ় সংকল্প করেছি।

 কী সৌভাগ্য আমাদের যে, আমরা জন্মেছি এই উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে, যখন আমাদের প্রত্যেকে এই দুঃসাহসিক ব্রতে যোগ দিয়ে কেবল ভারতবর্ষ নয়, পরিবর্তনশীল সমগ্র বিশ্বকে দেখতে পাবার ক্ষমতা রাখে। মহাভাগ্যবতী তুমি। বিপুল বিদ্রোহ যখন রুশদেশে নবযুগ নিয়ে এল, সেই বছরের সেই মাসে তোমার জন্ম। আর স্বদেশের এক মহাবিপ্লবেরও সাক্ষী তুমি, হয়তো একদিন এরই নাটমঞ্চে করবে অভিনয়। জগৎ জুড়ে দেখা দিয়েছে পরিবর্তন। সুদূর প্রাচ্যে চীনের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছে জাপান। এদিকে পশ্চিমে, বলতে গেলে সারা পৃথিবীতে, পুরোনো নিয়ম শিথিল হয়ে এসেছে, ভেঙে পড়বে বলে ভয়! দেশে দেশে আলোচনা চলছে নিরস্ত্রীকরণের, এদিকে প্রত্যেকের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রত্যেকে সম্পূর্ণ সশস্ত্র হয়ে রয়েছে। জগৎ জড়ে এতকাল পুঁজিবাদীদের যে প্রাধান্য চলছিল তার দিন শেষ হয়ে আসছে। আর যাবেই যখন, তখন যেদিন সে যাবে, সঙ্গে নিয়ে যাবে বহু পাপ, বহু আবর্জনা।


২৩

পরিপ্রেক্ষা

২৯শে মার্চ, ১৯৩২

 অনন্ত যুগের মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রাপথের কোন্ জায়গায় এসে পৌঁচেছি আমরা? আগেই তো প্রাচীন মিশর, ভারত, চীন ও নোশসের বিষয়ে কিছু আলোচনা করেছি। দেখেছি, যে সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল পিরামিডের, মিশরের সেই পুরাতন ও অপূর্ব সভ্যতা কী করে ধীরে ধীরে হৃতবল হয়ে ক্রমে এক নিরাকার অপচ্ছায়ায় পরিণত হয়ে গেল, প্রকৃত প্রাণের স্পন্দন রইল না তাতে, রইল কেবল কাঠামোটা আর কতকগুলো স্মৃতিচিহ্ন। গ্রীস দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে প্রতিবেশী-জাত এসে কী করে নোশসকে ধ্বংস করে ফেলেছিল তাও দেখেছি। সদ্যারদ্ধ ভারত ও চীনের অস্পষ্ট সুদূর প্রতিচ্ছবিও দেখেছি, উপকরণের অভাবে জানতে পারি নি বিশেষ কিছুই, তবুও উপলব্ধি করেছি সেকালের মহান সভ্যতাকে, আর বিস্মিত হয়েছি বহু সহস্র বছর আগেও সভ্যতার ক্ষেত্রে এই দেশদুটি কীভাবে সংযুক্ত ছিল, তাই দেখে। মেসোপটেমিয়াতেও স্বল্পকালের জন্যে কী করে সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, তার পরে সকল সাম্রাজ্য যে পথে গেছে সেই পথেই চলে যাচ্ছে, তারই আভাস পেয়েছি।

 খৃষ্টের পাঁচ-শো ছ-শো বছর আগে বড়ো বড়ো মনীষী যাঁরা বিভিন্ন দেশে জন্মেছিলেন, তাঁদের কথাও কিছু কিছু বলেছি—বলেছি ভারতের বুদ্ধ আর মহাবীর, চীনের লাওসে আর কনফুসিয়স, পারশ্যের জরথুস্ট্র, আর গ্রীসের পাইথাগোরাসের কথা। বুদ্ধ পুরোহিতদের এবং ভারতের প্রাচীন বৈদিক ধর্মের তৎকালীন রূপকে আক্রমণ করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, কুসংস্কার ও পূজা-অর্চনাই জনগণের মন ভোলাচ্ছে এবং তাদের প্রতারিত করছে। জাতিবিভাগ ছিল তাঁর অপ্রিয় এবং তিনি সাম্যের প্রচার করে গিয়েছিলেন।

 তার পরে আমরা ফিরে চলেছিলাম পশ্চিমে, এশিয়া ও ইউরোপ মিলেছে যেখানে, চলেছিলাম পারশ্য-গ্রীসের অদৃষ্টলেখার অনুসরণ করে—কী করে পারশ্যে গড়ে উঠল এক বিরাট সাম্রাজ্য আর ‘রাজার রাজা’ দারিয়ুস তাকে ভারতের সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত প্রসারিত করলেন; কী করে এই সাম্রাজ্যটি ছোট্ট গ্রীসকে চেয়েছিল গ্রাস করতে, কিন্তু সবিস্ময়ে দেখেছিল যে, এই ক্ষুদ্র দেশটিও উল্টে যুদ্ধ করতে এবং নিজেরটা ধরে রাখতে পারে। তার পরে চলেছিলাম গ্রীক