বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৭৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

২৪

দেবপ্রিয় অশোক

৩০শে মার্চ, ১৯৩২

 বোধহয় রাজামহারাজাদের খাটো করে দেওয়াটা আমার একটু বেশিরকম ভালো লাগে। তাঁদের মধ্যে শ্রদ্ধা বা তারিফ করার যোগ্য গুণ আমি খুব কমই দেখি। কিন্তু এবার আমি যাঁর কথা বলছি তিনি রাজা বা সম্রাট হয়েও ছিলেন মহৎ ও শ্রদ্ধার্হ। তিনি অশোক, মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র। এইচ, জি, ওয়েল্‌স্ (যাঁর রোমাঞ্চকর বইগুলির কিছু কিছু তুমি হয়তো পড়েছ) তাঁর ‘ইতিহাসের কাঠামো’ বইয়ে অশোক সম্বন্ধে বলেছেন, ‘ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ভিড় করে রয়েছে যেসব রাজারাজড়াদের নাম, শ্রীমন্মহারাজ, শ্রীল শ্রীশ্রীমহাধিপ ইত্যাদি, তাদের মধ্যে অশোকের নামও দীপ্তিমান এবং বলতে গেলে একমাত্র অশোকের নামেরই রয়েছে দীপ্তি, যেন একটি নক্ষত্র। ভল্‌গা থেকে জাপান পর্যন্ত আজও তাঁর নাম সম্মানিত হয়। চীন, তিব্বত, এবং তাঁর ধর্ম ত্যাগ করা সত্ত্বেও ভারতবর্ষ, তাঁর মহিমার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রেখেছে। কন্‌স্টান্‌টাইন বা শার্লামেনের নাম যারা শুনেছে তাদের চেয়ে ঢের বেশি লোকের স্মৃতিপটে অশোক অবিস্মরণীয়।’

 এটা সত্যই খুব বড়ো সম্মান, কিন্তু এ তাঁর প্রাপ্য; এবং ভারতবাসীর পক্ষে ভারতের ইতিহাসের এই যুগটি কল্পনা করা বিশেষ সুখদায়ক।

 খৃষ্টাব্দ আরম্ভ হওয়ার প্রায় তিন শো বছর আগে চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যু ঘটে। তাঁর পরে তাঁর ছেলে বিন্দুসার পঁচিশ বছর শান্তভাবে রাজত্ব করে গেছেন বলেই মনে হয়। গ্রীক জগতের সঙ্গে তিনি সম্বন্ধ রক্ষা করেছিলেন, মিশরে টলেমির এবং পশ্চিম এশিয়াতে সেলিউকসের ছেলে অ্যাণ্টিওকাসের সভা থেকে তাঁর কাছে দূত আসত। বহির্জগতের সঙ্গে বাণিজ্যও চলত। শোনা যায় মিশরীয়রা নাকি ভারতবর্ষ থেকে নীল আমদানি করে তাই দিয়ে তাদের কাপড় রঙাত। আরও শোনা যায়, ভারতের মসলিন হত তাদের মমিদের আবরণ। বিহারে কতকগুলি পুরোনো ভগ্নাবশেষ আবিষ্কার করে দেখা গেছে যে, মৌর্যযুগের পূর্বেও ভারতে একরকম কাঁচ তৈরি হত।

 জেনে খুশি হবে যে, চন্দ্রগুপ্তের সভায় আগত গ্রীক দূত মেগাস্থিনিস ভারতীয়দের শিল্প ও সৌন্দর্যপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে গেছেন এবং বিশেষভাবে বলেছেন সেকালে পাদুকার ব্যবহারের কথা। কাজেই ‘হাই হীল’ জুতো পরোপরি নূতন উদ্ভাবন নয়!

 ২৬৮ খৃষ্টপূর্বাব্দে বিন্দুসারের পরে বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হলেন অশোক। সে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল সম্পূর্ণ উত্তর ও মধ্য ভারত, এমনকি মধ্য-এশিয়ার খানিক অংশ। রাজত্বের নবম বর্ষে বোধহয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব-ভারতের অন্যান্য অংশগুলিকে রাজ্যের মধ্যে আনবার সংকল্প নিয়ে তিনি কলিঙ্গবিজয় আরম্ভ করেন। ভারতের পূর্ব-উপকূলে কলিঙ্গ—মহানদী গোদাবরী ও কৃষ্ণা নদীর মাঝখানে। কলিঙ্গবাসীরা যুদ্ধ করল বীরের মতো, কিন্তু অবশেষে ভীষণ ধ্বংসলীলার পরে বিজিত হল। এই সংগ্রাম ও বীভৎস অত্যাচার এত গভীরভাবে অশোককে আঘাত করল যে, যুদ্ধ ও সকল সামরিক কার্যকলাপের উপর তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মে গেল। এর পর থেকে তাঁর আর যুদ্ধ করা হল না। দক্ষিণের এক ক্ষুদ্র খণ্ড বাদে সমগ্র ভারত ছিল তাঁর অধীন আর এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডটিও তিনি অনায়াসেই জয় করতে পারতেন। এইচ, জি, ওয়েল্‌সের মতে, ইতিহাসে উল্লিখিত তিনিই একমাত্র সম্রাট যিনি বিজয়লাভ সত্ত্বেও যুদ্ধবৃত্তি ত্যাগ করতে পেরেছিলেন।

 আমাদের সৌভাগ্য, আমরা অশোকের কীর্তিকথা এবং চিন্তাধারা তাঁর নিজের ভাষাতেই পাই। পাথর অথবা ধাতুর উপর খোদিত অসংখ্য লিপিখণ্ডে আমরা তাঁর বাণী দেখতে পাই সমসাময়িক জনগণের ও ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্যে। জানো তো, এলাহাবাদ দুর্গে এইরকম একটি অশোকস্তম্ভ আছে। এরকম আরও বহু আছে আমাদের প্রদেশে।