বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৭৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৫৮
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

 এইসব লিপিতে অশোক আমাদের বলেছেন যুদ্ধ এবং দেশবিজয়ে তাঁর আতঙ্ক ও বিষাদের কথা। তিনি বলেছেন, ধর্মের সাহায্যে নিজেকে ও অন্যের হ্রদয় জয় করাই প্রকৃত বিজয়লাভ। আমি এই বাণীগুলির কয়েকটি তোমার জন্যে উল্লেখ করব। সেগুলি পড়তে বেশ লাগে, তারা অশোককে তোমার কাছে স্পষ্ট করে তুলবে। একটি লিপিতে আছে:

 অষ্টবর্ষ রাজত্বের পর কলিঙ্গদেশ শ্রীমন্মহারাজকর্তৃক বিজিত হইয়াছিল। তাহাতে দেড় লক্ষ কলিঙ্গাবাসী বন্দী হইয়াছিল, এক লক্ষ নিহত হইয়াছিল ও তাহার বহুগুণ লোক মৃত্যুবরণ করিয়াছিল।

 কলিঙ্গবিজয়ের অব্যবহিত পরেই মহারাজের ধর্মনীতিপ্রিয়তা বা তাহার সংরক্ষণ ও পালনে উৎসাহের সূচনা হয়। এইরূপে কলিঙ্গবিজয়ের পর মহারাজের হদয়ে বিষাদ উপস্থিত হয়, কারণ দেশবিজয়ের জন্য বহু বন্দীকরণ, অত্যাচার ও হত্যাসাধন আবশ্যক। ইহা সম্রাটের পক্ষে গভীর শোকসন্তাপের বিষয়।

 লিপিতে আরও আছে যে অশোক কলিঙ্গের যুদ্ধে নিহত বা বন্দীদের একশত বা একসহস্রভাগ লোকের হত্যা বা নিপীড়নও আর সহ্য করবেন না।

 উপরন্তু, কেহ যদি তাঁহার প্রতি অবিচার করে তাহাও সম্রাট যথাসম্ভব ধীরভাবে বহন করিবেন। রাজ্যের বন্যজাতিগুলির উপরও মহানুভব সম্রাট সদয়, তিনি তাহাদের চিন্তাশক্তিকে ঠিকপথে লইয়া যান, নতুবা তাঁহার মনে অনুতাপ জন্মিবে, কারণ সম্রাট মনে করেন, প্রত্যেক সজীব বস্তুরই নিরাপত্তা, আত্মসংযম, মনের শান্তি ও প্রফুল্লতা থাকা উচিত।

 অশোক আরও বুঝিয়েছেন যে, কর্তব্য বা ধর্মপরায়ণতা দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করাই প্রকৃত জয়লাভ এবং তিনি কেবল দেশে নয় বিদেশেও এরকম বিজয়গৌরব ইতিপূর্বেই অর্জন করেছেন।

 এই লিপিগুলিতে যে ধর্মনীতির তিনি বারংবার উল্লেখ করেছেন তা বুদ্ধের ধর্মনীতি। অশোক স্বয়ং একনিষ্ঠ বৌদ্ধ ছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মের প্রসারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর মধ্যে জোরের প্রশ্ন নেই। মানুষের হৃদয় জয় করে তাদের দীক্ষিত করতেন তিনি। ধর্মপ্রচারকেরা কদাচিৎ অশোকের মতো অন্যধর্মসহিষ্ণু হন। স্বীয় ধর্মে জনগণকে দীক্ষিত করতে তাঁরা প্রায়ই অবৈধভাবে শক্তিপ্রয়োগ, বঞ্চনা এবং ভীতিপ্রদর্শন করেন। সমগ্র ইতিহাস ধর্মের নামে অত্যাচার ও যুদ্ধবিরোধে পরিপূর্ণ এবং ঈশ্বরের নামে যত রক্তপাত সাধিত হয়েছে আর কোনো কারণেই বোধহয় তা হয় নি। অতএব ভারতের এক মহৎ ধর্মপ্রাণ সন্তান, এক সাম্রাজ্যনায়ক তাঁর নিজের চিন্তাধারার আলোয় অন্যদের আনতে কীরকম আচরণ করেছিলেন তা স্মরণ রাখা ভালো। ধর্ম আর বিশ্বাস যে তলোয়ার বা সঙিনের ফলা দিয়ে মানুষের অন্তরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, এ ভাবার মতো মূঢ়তা সত্যিই অদ্ভুত!

 অশোক-লিপিতে ‘দেবানাম্, প্রিয়’ অর্থাৎ ‘দেবতাদের প্রিয়’ বলে অশোকের উল্লেখ আছে—এই দেবপ্রিয় অশোক পশ্চিমে এশিয়া ইউরোপ আফ্রিকাতে তাঁর দূত ও চর পাঠালেন। তোমার স্মরণ আছে, সিংহলে তিনি তাঁর নিজের ভাই মহেন্দ্র ও বোন সংঘমিত্রাকে পাঠিয়েছিলেন এবং শোনা যায় তাঁরা গয়া থেকে পুণ্য বোধিদ্রুমের একটি শাখা বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনুরাধাপুরের মন্দিরে একটি বটগাছ দেখেছিলাম, মনে পড়ে? এ নাকি সেই প্রাচীনশাখাসম্ভূত।

 ভারতে বৌদ্ধধর্ম দ্রুত প্রসারিত হল। আর যেহেতু অশোকের ধর্ম অসার মন্ত্র-উচ্চারণ ও পূজো-অর্চনার অভিনয় নয়, মহৎ কার্য ও সামাজিক উন্নয়নের প্রচেষ্টাই তার লক্ষ্য, তাই দেশ জুড়ে নির্মিত হল বাগান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, কুয়ো প্রভৃতি। নারীশিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হল। চারটি বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্র—পেশোয়ারের কাছে সুদূর উত্তরে তক্ষশীলা, মথুরা (বর্তমানে ইংরেজদের দ্বারা বিশ্রীভাবে উচ্চারিত ‘মুট্‌রা’), মধ্য ভারতে উজ্জয়িনী ও বিহারে পাটনায় কাছে নালন্দা—কেবল ভারতের নয়, চীন থেকে পশ্চিম এশিয়া অবধি বহুদূরের ছাত্রদেরও আকর্ষণ করত, আর এই ছাত্রেরা বুদ্ধের অমৃতবাণী তাঁদের সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে যেতেন। দেশময় গড়ে উঠল বিরাট সব মঠ—তাদের বলা হত বিহার। পাটলিপুত্র বা পাটনার চারদিকে এইগুলি এত