বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৭৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
দেবপ্রিয় অশোক
৫৯

প্রচুর পরিমাণে গড়ে উঠল যে, সারা প্রদেশটারই নাম হয়ে গেল বিহার—সেই নামেই আজও একে ডাকা হয়। কিন্তু প্রায়ই যেমন ঘটে, এই মঠগুলি থেকে অল্পদিনের মধ্যেই শিক্ষাদানের উৎসাহ, চিন্তাশক্তির প্রেরণা চলে গেল, সেগুলি হয়ে দাঁড়াল লোকের দৈনিক কর্মসূচী অনুসরণ করে পূজা করার স্থান।

 জীবরক্ষার জন্যে অশোকের অনুরাগ পশু পাখি পর্যন্তও বিস্তৃত হয়েছিল। তাদের জন্যে বিশেষ চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়েছিল, পশুবলি হয়েছিল নিষিদ্ধ। এই দুটি ব্যাপারে তিনি আমাদের কালকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত পশুবলি আজও কিছু কিছু আছে, ধর্মের একটা অত্যাবশ্যক আনুষঙ্গিক বলেই তাকে ধরা হয়; অথচ একে ঠিকভাবে পালন করার বন্দোবস্ত খুব কমই আছে।

 অশোকের আদর্শ এবং বৌদ্ধধর্মের প্রসারের ফলে ভারতে নিরামিষ ভোজন খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তখন পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়েরা সাধারণত মাংস আহার ও মদ্য পান করতেন। এইবার মাংস ও মদ্য উভয়ের প্রচলনই বহুলপরিমাণে কমে এল।

 এইভাবে ৩৮ বছর অশোক রাজত্ব করলেন শান্তির সঙ্গে, জনহিতের জন্যেই ছিল তাঁর সর্বথা প্রয়াস। রাজকার্যের জন্যে তিনি সর্বদাই প্রস্তুত ছিলেন: “সর্বস্থানে, সর্বকালে, আমার আহারকালে বা পুরাঙ্গনাগণের কক্ষে, আমার শয়নগৃহে, অথবা আমার পরামর্শ শালায়, আমার রথের মধ্যে কিংবা আমার প্রাসাদকাননাভ্যন্তরে, রাজ্যের সংবাদদাতারা প্রজাবর্গের সংবাদ সম্বন্ধে আমাকে সর্বদা অবহিত রাখিবে। যদি কোনো বিপত্তি ঘটে, তৎক্ষণাৎ আমার সমীপে সংবাদ প্রেরিত হইবে, সে যে কালেই হউক এবং তখন আমি যে-কোনো স্থানেই থাকি না কেন; কারণ জনহিতই আমার কর্তব্য।”

 ২২৬ খৃষ্টপূর্বাব্দে অশোকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি বৌদ্ধসন্ন্যাসী হয়েছিলেন।

 মৌর্যযুগের ভগ্নাবশেষ আমরা সামান্যই পেয়েছি। কিন্তু যা পেয়েছি তা, আর্য সভ্যতার যত অবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, বলতে গেলে তার মধ্যে প্রাচীনতম; কারণ মোহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে আমাদের আলোচনার বহির্ভূত। বারাণসীর নিকটে সারনাথে সিংহচূড়াশোভিত সুন্দর অশোকস্তম্ভ দেখতে পাবে।

 অশোকের রাজধানী মহানগরী পাটলিপুত্রের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ১৫০০ বছর আগে, অশোকের ৬০০ বছর পরে, ফা-হিয়েন নামে এক চীনা পরিব্রাজক জায়গাটা দেখতে এসেছিলেন। নগরটি তখন ধনে জনে পূর্ণ, কিন্তু তবুও অশোকের পাষাণপ্রাসাদ ছিল চূর্ণ অবস্থায়। ফা-হিয়েন এই অবস্থায় তাকে দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর ভ্রমণলিপিতে আছে, এ প্রাসাদ মানুষের দ্বারা তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন নি।

 পাষাণে-গাঁথা বিরাট প্রাসাদ আজ তিরোহিত, কোনো চিহ্ন সে পিছনে ফেলে যায় নি। কিন্তু অশোকের স্মৃতি আজও সমগ্র এশিয়া মহাদেশ জুড়ে বেঁচে আছে, শিলালিপিতে খোদিত তাঁর বাণী আমাদের কাছে বোধ্য ও উপভোগ্য। এখনও সেগুলি থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয় বহু আছে। এ চিঠিটা খুব বড়ো হয়ে গেল, তোমার কাছে ক্লান্তিদায়ক হতে পারে। একটি লিপি থেকে অশোকের বাণী উদ্ধৃত করে দিয়ে শেষ করব:

 কোনো-না-কোনো কারণে সকল সম্প্রদায়ই শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের শ্রদ্ধা করলে মানুষ তার স্ব-সম্প্রদায়কে তো উন্নত করেই, তাছাড়া অন্যজাতিগুলির প্রতিও নিজের কর্তব্যপালন করে।