পারল। সেটি হচ্ছে এশিয়া-মাইনরে পার্গামম, আজ যেখানে তুরস্কের অবস্থান। সে একটি ছোট্ট গ্রীক রাজা, কিন্তু এক শো বছর ধরে গ্রীক শিল্পসভ্যতার নিবাস সেখানেই ছিল, সেখানেই গড়ে উঠেছিল বিরাট প্রাসাদ, গ্রন্থাগার ও যাদুঘর। একদিক দিয়ে সে ছিল সাগরপারের আলেকজান্দ্রিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী।
মিশরে টলেমিদের রাজধানী ছিল আলেকজান্দ্রিয়া। প্রাচীন পৃথিবীর খুব প্রসিদ্ধ নগর হয়ে উঠেছিল সেটি। এথেন্সের মহিমা বহুলপরিমাণে তখন খর্ব হয়েছে, তখন আলেকজান্দ্রিয়াই হল গ্রীক সভ্যতার কেন্দ্র। প্রাচীন পৃথিবীর পণ্ডিতদের মন তখন দর্শন, গণিত, ধর্ম ও অন্যান্য শাস্ত্রে পূর্ণ ছিল। যেসব ছাত্রেরা এই নিয়ে আলোচনা করত, আলেকজান্দ্রিয়ার বিশাল গ্রন্থভবন ও যাদুঘর ছিল তাঁদের লোভনীয়। ইউক্লিড, যাঁর কথা সব ছেলেমেয়েরা স্কুলে শুনেছে, তিনি ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ও অশোকের সমসাময়িক।
তুমি জানো, টলেমিরা ছিল গ্রীক; কিন্তু বহু মিশরীয় আচারব্যবহার তাদের মধ্যে এসে গিয়েছিল। মিশরের প্রাচীন দেবদেবীদেরও কেউ কেউ তাদের পূজা পেতেন। প্রাচীন গ্রীসের জুপিটার, অ্যাপোলো প্রভৃতি দেবতারা, যাঁদের কথা হোমর তাঁর মহাকাব্যে বহুবার বর্ণনা করেছেন—মহাভারতের বৈদিক দেবদেবীদের মতো, তাঁরা নূতন বেশে, নূতন নামে আবির্ভূত হলেন। প্রাচীন গ্রীসের ও প্রাচীন মিশরের আইসিস, ওসাইরিস, হোরাস প্রভৃতি দেবতাদের মধ্যে এক মিশ্রণ ঘটল, আর এই মিশ্রিত দেবতাদের খাড়া করা হল জনগণের সামনে পূজা করার জন্যে। যাকেই পূজা করা হোক-না, যে নামেই ডাকা হোক-না, যতক্ষণ পূজা করার মতো কিছু, আছে ততক্ষণ আর ভাবনা কী? এই নবনির্জরদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধি ‘সেরাপিস’দেবের।
আলেকজান্দ্রিয়া বাণিজ্যকেন্দ্রও ছিল এবং সভ্য পৃথিবীর অন্যান্য জায়গা থেকে বণিকেরা সেখানে আসত। আমরা শুনেছি, আলেকজান্দ্রিয়ায় একদল ভারতীয় বণিক থাকত এবং দক্ষিণভারতে মালাবার উপকূলে একদল আলেকজান্দ্রিয়ানিবাসী বণিকের বসত ছিল।
ভূমধ্যসাগরের পারে আলেকজান্দ্রিয়ার অদূরে রোম তখন বড়ো হয়ে উঠেছে, আরও বড়ো ও শক্তিশালী হবার চেষ্টায় আছে। আফ্রিকার কূলে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে কার্থেজ, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু। প্রাচীন পৃথিবীর সম্বন্ধে ধারণা জন্মাতে হলে তাদের কাহিনীও কিছুটা আলোচনা করতে হবে।
প্রাচ্যে তখন চীন হয়ে উঠছিল রোমের সমান; অশোকের সময়কার পৃথিবীর ছবি আঁকবার জন্যে তারও আলোচনা আমাদের করতে হবে।
২৬
চীন এবং হান বংশ
৩রা এপ্রিল, ১৯৩২
নাইনি জেল থেকে গত বছর তোমাকে যেসব চিঠি লিখেছি তাতে চীন দেশের প্রাচীন ইতিহাসের কথা কিছু কিছু বলেছি। হোয়াং হো নদীর তীরে তাদের বসবাসের শুরু থেকে তাদের প্রাচীন রাজবংশগুলির কথা—সিয়া-বংশ, সাং বা ঈন্ এবং চাউ-বংশের কথা বলেছি। কেমন করে ক্রমে ক্রমে চীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হল এবং বহু শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্র গড়ে উঠল, সেসব কথার আলোচনা করেছি। এর পরে আবার দেখা দিল বিশৃঙ্খলা, কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্র ভেঙে পড়ল। তখনও চাউ-বংশের রাজত্ব চলছে, কিন্তু সেটা নামে মাত্র। এখানে-সেখানে ছোটো ছোটো রাজারা স্বাধীন হয়ে বসেছে, আর নিজেদের মধ্যে সারাক্ষণ ঝগড়াঝাঁটি চলছে। দেশের এই দুরবস্থা চলল কয়েক শো বছর ধরে—চীন দেশে কিছু একটা ঘটলেই সেটার জের