চলতে থাকে হয় কয়েক শো নয় তো একেবারে কয়েক হাজার বছর ধরে। শেষটায় ডিউক অব্ চীন বলে স্থানীয় এক রাজা প্রাচীন চাউ-বংশের দুর্বল রাজাকে দিল তাড়িয়ে। এর বংশধরেরা চীন-বংশ বলে খ্যাতিলাভ করেছিল। এটি লক্ষ্য করবার বিষয় যে, এই চীন-বংশ থেকেই চীন দেশের নামকরণ হয়েছে।
খৃষ্টপূর্ব ২৫৫ অব্দে চীন দেশে এই চীন-বংশের রাজত্ব শুরু হল। এর ঠিক তেরো বছর পূর্বে ভারতবর্ষে অশোক তাঁর রাজত্ব শুরু করেছেন। কাজেই এখন চীন দেশে যাঁদের কথা বলছি তাঁরা অশোকের সমসাময়িক। প্রথম তিনজন চীন-সম্রাট খুব অল্পকাল রাজত্ব করেছিলেন। তার পরে খৃষ্টপূর্ব ২৪৬ অব্দে এই বংশের চতুর্থ রাজা সিংহাসনে বসেন; কোনো কোনো দিক থেকে এঁকে রীতিমতো স্বনামধন্য বলা যেতে পারে। এঁর নাম ছিল ওয়াও চেঙ, কিন্তু পরে তিনি অন্য নাম গ্রহণ করেন—শি হুয়াঙ টি। এই দ্বিতীয় নামেই তিনি সাধারণত পরিচিত। কথাটার মানে হল—প্রথম সম্রাট। বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, তাঁর নিজের এবং নিজের কাল সম্বন্ধে তাঁর খুব উচ্চ ধারণা ছিল। কিন্তু অতীতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল না। বস্তুত তিনি চেয়েছিলেন, লোকেরা অতীতের কথা ভুলে যায় এবং তাঁকে নিয়েই ইতিহাসের শুরু হয়েছে এরকম ভাবতে শেখে। এইজনোই তাঁর নাম হল, সর্বপ্রথম সম্রাট। তাঁর আগেও যে দু হাজার বছর ধরে কত কত সম্রাট চীন দেশে রাজত্ব করে গেছেন, সেসব তিনি উড়িয়েই দিলেন। এমনকি, তিনি দেশ থেকে তাঁদের নাম, স্মৃতি পর্যন্ত লোপ করে দেবার চেষ্টা করলেন। আর কেবল প্রাচীন সম্রাটই নয়, অতীতে দেশে যতসব প্রসিদ্ধ ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল তাঁদের কথাও ভুলতে হবে। কাজেই তিনি হুকুম জারি করলেন যে, অতীতের সব গ্রন্থ, বিশেষ করে ইতিহাস-সম্বন্ধীয় এবং কন্ফুসিয়সের ধর্মতত্ত্ব-সম্বন্ধীয় গ্রন্থ সব পুড়িয়ে নষ্ট করে দিতে হবে। কেবলমাত্র চিকিৎসা এবং বিজ্ঞান-বিষয়ক বই ধংস থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাঁর হকুমনামায় তিনি বলেছিলেন, ‘যারা বর্তমানকে ছোটো করবার জন্য অতীতকে বড়ো করে দেখবে তাদের সপরিবারে হত্যা করা হবে।’
তাঁর যে কথা সেই কাজ। বহু পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁদের প্রিয় গ্রন্থগুলিকে লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তাঁদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দিয়েছিলেন। তা হলেই দেখতে পাচ্ছ, আমাদের এই প্রথম-সম্রাটটি কীরকম কোমলচিত্ত এবং অমায়িক প্রকৃতির লোক ছিলেন! ভারতবর্ষে যখন লোকের মুখে অতীতের অতিরিক্ত স্তুতি শুনতে পাই, তখন এঁর কথা আমার মনে পড়ে এবং খানিকটা সহানভূতিও হয়। আমাদের দেশে বহু লোক কেবলই অতীতের দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, অতীতের স্মৃতিগান করে এবং অতীতের দিকেই সব কিছুর অনুপ্রেরণার জন্য চেয়ে থাকে। অতীত যদি সত্যই বড়ো কাজে অনুপ্রেরণা জোগায়, তবে অতীতকে নিশ্চয় মেনে নেব; কিন্তু কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো জাতি যদি সারাক্ষণ পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকে তবে তাকে আমি শুভ লক্ষণ বলে মনে করি না। সেই-যে কে একজন বলেছেন, পিছন দিকে চাওয়া এবং পিছনে যাওয়াই যদি মানুষের উদ্দেশ্য হত তবে তার চোখদুটো মাথার সমুখে না থেকে পিছনেই থাকত। আমাদের অতীতকে জানতে মানা নেই, অতীতে প্রশংসার বস্তু থাকলে প্রশংসা করতেও বাধা নেই, কিন্তু আমাদের চোখের দৃষ্টি রাখতে হবে সামনে এবং পাদুটোও এগিয়ে চলবে সামনের দিকে। শি হুয়াঙ টি প্রাচীন গ্রন্থগুলি ধ্বংস করে এবং তাদের পাঠকদের জ্যান্ত পুঁতে দিয়ে যে অত্যন্ত নৃশংস কাজ করেছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফল হল এই যে, তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সব কীর্তি শেষ হয়ে গেল। তাঁর সাধু ইচ্ছেটা ছিল, তিনি হবেন প্রথম সম্রাট এবং তাঁর পরে দ্বিতীয় তৃতীয় এমন করে অনন্তকাল ধরে তাঁর বংশের রাজারাই রাজত্ব করে যাবেন। কিন্তু অদৃষ্টের এমনি পরিহাস, চীন দেশের সব রাজবংশের মধ্যে এই চীন-রাজাদের রাজত্বকালই সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী। আগেই তো বলেছি, ও দেশের কোনো কোনো রাজবংশ শত শত বৎসর ধরে রাজত্ব করেছে। এই চীনদেরই ঠিক আগে যে বংশ রাজত্ব করেছিল তাদেরও রাজত্ব চলেছে আট শো সাতষট্টি বছর। কিন্তু পরাক্রান্ত চীন-রাজারা হঠাৎ দেখা দিয়ে যুদ্ধ জয় করে শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপন করে কেবলমাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই আবার