লোপ পেয়ে গেল। শি হুয়াঙ টি ভেবেছিলেন, তিনি হবেন বিরাট এক রাজবংশের স্থাপয়িতা। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব ২০৯ অব্দে তাঁর মৃত্যু হলে পর তিন বছরের মধ্যেই এই রাজবংশের অবসান হল। কন্ফুসিয়স-সম্বন্ধীয় এবং অন্যান্য সব গ্রন্থ, যা মাটির তলায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, অবিলম্বে সেগুলো খুঁড়ে বের করা হল এবং পূর্বের মতোই আবার তাদের সমাদর হল।
রাজা হিসাবে শি হুয়াঙ টি-কে চীন দেশের অন্যতম পরাক্রান্ত সম্রাট বলা যায়। দেশময় যতসব ছোটোখাটো রাজা ছড়িয়ে ছিল, তিনি তাদের সকলকে দমন করে সামন্ততন্ত্রের উচ্ছেদ করেন এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্র গড়ে তোলেন। তিনি সমগ্র চীন দেশ, এমনকি আন্নাম রাজ্য জয় করেছিলেন। তিনিই চীনের বিখ্যাত প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেছিলেন। এটা যদিচ খুব ব্যয়সাধ্য হয়ে উঠেছিল, তবু চীনারা ভাবল, বিদেশী শত্রুর থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিরাট সৈনাদল পোষণ করার চেয়ে এই প্রাচীর নির্মাণে টাকা ব্যয় করা শ্রেয়। এই প্রাচীরের দ্বারা নিশ্চয় কোনো বড়ো আক্রমণকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। ছোটোখাটো আক্রমণ প্রতিরোধ করা চলত: কিন্তু এই থেকে বোঝা যায়, চীনারা শান্তিপ্রিয় ছিল এবং যথেষ্ট শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা সামরিক গৌরবের প্রয়াসী ছিল না।
শি হুয়াঙ টি অর্থাৎ প্রথম-সম্রাটের মৃত্যুর পরে তাঁর বংশে দ্বিতীয় সম্রাট পাওয়া গেল না কিন্তু তাঁর সময় থেকেই চীন দেশে একটি ঐক্যের ধারা চলে আসছে।
এর পরে আর-একটি রাজবংশের উদয় হল—এটির নাম হান-বংশ। এই বংশটি চার শো বৎসরেরও বেশি রাজত্ব করেছিল। গোড়ার দিকে এই বংশের একটি স্ত্রীলোকেও কিছুদিন রাজত্ব করেছিলেন। এঁদের ষষ্ঠ রাজা উ-টি চীন দেশের খ্যাতনামা এবং পরাক্রমশালী রাজাদের অন্যতম। ইনি পঞ্চাশ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেছিলেন। তখন তাতার দস্যুরা ক্রমাগত উত্তর-চীন আক্রমণ করছিল, তিনি তাদের যুদ্ধে পরাজিত করেন। পূর্বদিকে কোরিয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমে একেবারে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত চীন সম্রাটের আধিপত্য বিস্তৃত হয়েছিল; মধ্য-এশিয়ার সব জাতিগুলি তাঁকে অধীশ্বর বলে মেনে নিয়েছিল। এশিয়ার মানচিত্রের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে খৃষ্টপূর্ব প্রথম এবং দ্বিতীয় শতকে চীনের শক্তি এবং প্রভাব কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ঠিক ঐ সময়ে রোম সাম্রাজ্যও খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, বহু গ্রন্থেই আমরা এসব কথা দেখতে পাই, তাই থেকে অনেকে মনে করেন রোমের শক্তি বুঝি তখন সমগ্র পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছিল। রোমকে বলা হয়েছে ‘সসাগরা পৃথিবীর অধিশ্বরী’। অবশ্য রোম সে সময়ে বড়ো হয়েছিল, তার শক্তিও ক্রমে বাড়ছিল। কিন্তু এর তুলনায় চীন-সাম্রাজ্য অনেক বড়ো, অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।
খুব সম্ভব সম্রাট উ-টির সময় থেকেই চীন এবং রোমের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পার্থিয়ানদের সহযোগিতায় এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-ব্যবহার চলছিল। পার্থিয়ানদের বাস ছিল বর্তমান পারশ্য এবং মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে। পরে যখন রোমের সঙ্গে পার্থিয়ার যুদ্ধ বাধে, তখন কিছুকালের জন্য ঐ বাণিজ্যসূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। রোম তখন সমুদ্রপথে সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করল। একটি রোমান জাহাজ সত্যিসত্যি চীনে এসে পৌঁচেছিল। কিন্তু এসব হল গিয়ে খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর ঘটনা। আমরা এখন যে সময়ের কথা আলোচনা করছি সেটা খৃষ্টপূর্ব যুগের কথা।
হান-বংশের রাজত্বকালেই চীন দেশে বৌদ্ধধর্মের প্রথম আমদানি হয়। খৃষ্টীয় যুগের আগে থেকেই চীনের লোকেরা বৌদ্ধধর্মের কথা শুনে এসেছে, কিন্তু তার প্রচার শুরু হয়েছে পরে। কথিত আছে, তৎকালীন চীন-সম্রাট নাকি একদা স্বপ্নে এক অদ্ভুত মূর্তি দেখেছিলেন—ষোলো ফিট দীর্ঘ তাঁর দেহ, মাথা থেকে অপূর্ব জ্যোতি বিকীর্ণ হচ্ছে। সেই স্বপ্নমূর্তিটিকে তিনি পশ্চিম দিক থেকে আসতে দেখেছিলেন, সুতরাং তিনি সেই দিকে তাঁর দূত প্রেরণ করেন। কিছুকাল পরে দূতেরা ফিরে এল, সঙ্গে তাদের বুদ্ধমূর্তি এবং বৌদ্ধধর্মের গ্রন্থাবলী। বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সঙ্গে চীন দেশে ভারতীয় শিল্পকলার প্রভাব বিস্তৃত হয়। ক্রমে চীন থেকে কোরিয়া এবং কোরিয়া থেকে জাপান পর্যন্ত এই প্রভাব বিস্তারলাভ করে।