হান বংশের রাজত্বকালে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। একটি হচ্ছে কাষ্ঠফলকের সাহায্যে মুদ্রণশিল্পের উদ্ভাবন, যদিচ উদ্ভাবন সত্ত্বেও প্রায় হাজার বছর কাল এর তেমন প্রচলন হয় নি। তা হলেও এ বিষয়ে চীন দেশ ইউরোপের তুলনায় পাঁচ শত বছর অগ্রগামী।
দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ব্যাপারটি হচ্ছে, রাজকর্মচারী নিয়োগের জন্য পরীক্ষাপ্রণালী-প্রবর্তন। আমি জানি ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা-জিনিষটা ভালোবাসে না, এ বিষয়ে তাদের প্রতি আমার সম্পূর্ণ সহানভূতি আছে। কিন্তু সেই যুগেও যে চীন দেশে কর্মচারী-নিয়োগের এরূপ একটি ব্যবস্থা ছিল সেটি আমার কাছে বড়ো আশ্চর্য ঠেকে। অন্যানা দেশে এই সেদিনও কর্মচারী নিযুক্ত হত বেশির ভাগই খোশামুদির জোরে এবং সেসব চাকুরি বিশেষ বিশেষ শ্রেণী কিংবা উচ্চবর্ণের মধ্যেই আবদ্ধ থাকত। চীন দেশে চাকুরি জিনিষটা বিশেষ কোনো শ্রেণীর একচেটিয়া সম্পত্তি ছিল না। যে কেউ পরীক্ষা পাশ করতে পারলে সরকারি চাকুরি পেত। অবশ্য আমি বলছি না যে এটাই একটা আদর্শ ব্যবস্থা, কারণ, কন্ফুসীয় শাস্ত্রে খুব ভালো করে পরীক্ষা পাশ করেও রাজকর্মচারী হিসাবে অপদার্থ হওয়া কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু খোশামুদি আবদার ইত্যাদির চেয়ে এই নিয়মটা যে ঢের ভালো তা স্বীকার করতেই হবে এবং মনে রাখা উচিত যে, দু হাজার বছর ধরে চীন দেশে এ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এই অল্প কিছুদিন হল এ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে।
২৭
রোম-কার্থেজ সংঘর্ষ
৫ই এপ্রিল, ১৯৩২
দূরপ্রাচ্য থেকে এবার আমরা পশ্চিমে যাব এবং রোমের ইতিহাস সম্বন্ধে আলোচনা করব। কথিত আছে, খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে নাকি রোম নগর স্থাপিত হয়েছিল। রোমানরা বোধকরি আর্যদেরই বংশধর হবে। টাইবার নদীর তীরে যে সাতটি পাহাড় আছে তারই আশেপাশে এরা বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করছিল। ক্রমে এই বিক্ষিপ্ত বাসস্থানগুলি মিলিয়ে একটি নগরী গড়ে উঠল। এই নগর-রাষ্ট্রটি ক্রমেই বেড়ে চলল এবং ধীরে ধীরে বিস্তারলাভ করে একেবারে ইতালির দক্ষিণে সমুদ্রতীরবর্তী মেসিনা নগর পর্যন্ত বিস্তৃত হল।
গ্রীস দেশের নগর-রাষ্ট্রগলির কথা বোধহয় তোমার মনে আছে। গ্রীকরা যেখানেই গিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে তাদের নগর-রাষ্ট্রও গিয়েছে, ফলে ভূমধ্যসাগরের উপকূলভূমি গ্রীক উপনিবেশ এবং নগর-রাষ্ট্রে ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রোমে আমরা যে রাষ্ট্র দেখতে পাচ্ছি সেটা সম্পূর্ণ আলাদা জাতের। গোড়ার দিকে রোম বোধকরি অনেকটা গ্রীক নগর-রাষ্ট্রের মতোই ছিল; কিন্তু রোম ক্রমে প্রতিবেশী জাতগুলোকে যুদ্ধে পরাজিত করে রাজ্যবিস্তার করতে লাগল। এইভাবে রোমরাষ্ট্র কেবল বেড়েই চলল, শেষটায় প্রায় সমগ্র ইতালি ঐ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হল। এতবড়ো রাজ্যকে আর নগর-রাষ্ট্র বলা চলে না। রোম ছিল শাসনকেন্দ্র, সেইখান থেকে সমগ্র রাজ্য শাসন করা হত। আর রোম নগরের শাসনব্যবস্থাটিও ছিল অদ্ভুত ধরনের। এখানে রাজা, সম্রাট কেউ ছিল না, আবার প্রজাতন্ত্র বলতে আজকাল যা বোঝায় তেমন ধারাও কিছু ছিল না। তথাপি শাসনপ্রণালীটা খানিকটা ছিল প্রজাতন্ত্রের মতোই, যদিচ ধনী জমিদারদের হাতেই ছিল প্রাধান্য। বিধিনিয়ম অনুযায়ী শাসনক্ষমতা ছিল সিনেট সভার হাতে, কিন্তু সিনেটের সভ্য মনোনয়নের ভার ছিল দুজন কন্সালের উপর। এই কন্সাল-দুজন নাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। বহুকাল পর্যন্ত কেবলমাত্র অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকেরাই সিনেটের সভ্য হতে পারতেন। সমগ্র রোমান জাতি দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। একটিকে বলা হত প্যাট্রিসিয়ান—এরা ছিল ধনী অভিজাতসম্প্রদায়, বেশির ভাগই জমিদার। অপর শ্রেণীটিকে বলা হত প্লিবিয়ান, এরা ছিল সাধারণ