নাগরিকের দল। গোড়ার দিকে কয়েক শো বছর ধরে রোমান রাষ্ট্র বা সাধারণতন্ত্রের ইতিহাস, বলতে গেলে, এই দুই শ্রেণীর মধ্যে সংঘর্ষেরই ইতিহাস। প্যাট্রিসিয়ানদের হাতেই ছিল সব ক্ষমতা, আর যেখানে ক্ষমতা টাকাপয়সাও সেখানেই এসে জমে। ওদিকে প্লিবিয়ান বা প্লেবরা ছিল নিঃস্ব এবং নিঃসহায়ের দল; তাদের না ছিল ক্ষমতা, না ছিল অর্থ। ক্ষমতালাভের জন্য তারা শুরু করল সংগ্রাম, তার ফলে কখনও কখনও এক-আধটু সুযোগ-সুবিধা কপালক্রমে জুটত। এখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য। এই দীর্ঘকালব্যাপী সংগ্রামের সূত্রে প্লেবরা একবার একধরনের অসহযোগ-পন্থা অবলম্বন করেছিল এবং তাতে বেশ ফলও পেয়েছিল। তারা সব দল বেঁধে রোম ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে নঁতন এক শহরে আস্তানা করল। প্যাট্রিসিয়ানরা তাতে ভয় পেয়ে গেল, কারণ প্লেবদের না হলে তাদের চলে না। কাজেই কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের সঙ্গে আপোসনিষ্পত্তি করতে হল। এইভাবে ক্রমে ক্রমে প্লিবিয়ানরা উচ্চপদ-লাভের অধিকার পেল, এমনকি সিনেটের সভ্য হওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হল।
এতক্ষণ আমরা শুধু প্যাট্রিসিয়ান এবং প্লিবিয়ানদের ঝগড়াবিবাদের কথাই বলে আসছি। তাতে কারও কারও মনে হবে, এরা ছাড়া রোমে বুঝি আর কোনো লোক ছিল না। আসলে কিন্তু তা নয়; এই দুটি শ্রেণী ছাড়াও রোম-রাষ্ট্রে বহু সংখ্যক ক্রীতদাস বাস করত। এদের কোনোরকম নাগরিক অধিকার ছিল না, ভোট দেবার ক্ষমতাও ছিল না। গরু-ভেড়ার মতো এরা ছিল তাদের মনিবের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। মনিবরা খোশ-খুশিমতো এদের বিক্রিও করে দিতে পারত। আবার ইচ্ছে হল তো দাসত্ব থেকে মুক্তিও দিতে পারত। এসব মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের নিয়ে দেশে আর-একটা নূতন শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। সেই যুগে পাশ্চাত্য দেশগুলিতে ক্রীতদাসের চাহিদা ছিল খুব বেশি। তার ফলে স্থানে স্থানে দাস-ব্যবসায়ের বিরাট বিরাট ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল। এসব ব্যবসায়ীরা দল বেঁধে গিয়ে দূরদেশ থেকে স্ত্রীপুরুষ বাচ্চাকাচ্চা জোর করে ধরে নিয়ে আসত এবং তাদের ক্রীতদাসরূপে বিক্রি করত। প্রাচীন গ্রীস, রোম এবং মিশরের ঐশ্বর্যের মূলে ছিল এই দাস-ব্যবসা।
ভারতবর্ষেও কি এরকম দাস-ব্যবসায় প্রচলিত ছিল, এই প্রশ্ন স্বভাবতই মনে জাগে। খুব সম্ভব ছিল না। চীন দেশেও ছিল বলে মনে হয় না। অবশ্য ভারতবর্ষ কিংবা চীন দেশে দাস-প্রথার কোনো অস্তিত্বই ছিল না এমন কথা জোর করে বলা যায় না। বিস্তৃতভাবে দাস-ব্যবসায় প্রচলিত না থাকলেও কোনো কোনো পরিবারে ক্রীতদাস দেখা যেত। পরিবারস্থ চাকরবাকরদের মধ্যে কতক লোক ছিল যাদের ক্রীতদাস বলা যেতে পারত। কিন্তু অন্যান্য দেশে খেতখামারের কাজে যেমন অগণিত লোককে কেনা-গোলামের মতো ব্যবহার করা হত, চীন কিংবা ভারতবর্ষে সেরকম কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তা হলেই দেখা যাচ্ছে, এই দুটি দেশে অন্তত দাসপ্রথা নিতান্ত জঘন্য আকারে কখনও দেখা দেয় নি।
যাক, এদিকে রোম ক্রমেই বড়ো হয়ে চলল। আর প্যাট্রিসিয়ানদের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হতে লাগল। কিন্তু প্লিবিয়ানদের অবস্থার কোনো ইতরবিশেষ হল না। প্যাট্রিসিয়ানরা আগের মতোই ওদের উপর কর্তৃত্ব করতে লাগল। আবার প্যাট্রিসিয়ান এবং প্লিবিয়ান দুই দলই প্রভু হয়ে ক্রীতদাস বেচারিদের ঘাড়ে চেপে রইল।
রোম ক্রমে বড়ো হয়ে চলছে; কিন্তু এখন এর শাসনব্যবস্থা চলছে কীভাবে, সেই হল প্রশ্ন। আগেই তো বলেছি শাসনভার ছিল সিনেট সভার হাতে। সিনেটের সভ্যরা ছিলেন মনোনীত সদস্য। মনোনয়নের ভার ছিল দুজন কন্সালের উপর। এঁরা দুজন ছিলেন নির্বাচিত ব্যক্তি। নাগরিকেরা ভোট দিয়ে এঁদের নির্বাচন করত। গোড়ার দিকে রোম যখন একটি ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্র মাত্র ছিল, তখন নাগরিকেরা সকলে রোম নগরে কিংবা তারই আশেপাশে বাস করত। সবাই এক জায়গায় একত্র হয়ে ভোট দেওয়া এদের পক্ষে কিছুই কষ্টকর ছিল না। কিন্তু ক্রমে রোম যখন বিস্তারলাভ করল, তখন বহু সংখ্যক নাগরিক হয়ে পড়ল দূরের বাসিন্দা। তাদের পক্ষে ভোট দেওয়া ক্রমেই দুষ্কর হয়ে পড়ল। আজকাল যাকে বলা হয় প্রতিনিধিমূলক গবর্মেণ্ট, সেকালে তা ছিল না। জাতীয় আইনসভা, পার্লামেণ্ট কিংবা কংগ্রেসে আজকাল প্রত্যেক ভোটকেন্দ্র থেকেই একজন করে প্রতিনিধি