বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৮৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
রোম-কার্থেজ সংঘর্ষ
৬৭

পাঠানো হয়; সুতরাং বলতে গেলে, নির্বাচিত সদস্যগণ সমগ্র জাতিটারই প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু প্রাচীন রোমানগণ এ দিকটা খেয়াল করে নি। তারা রোম নগরীতে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করত; কিন্তু দূরবর্তী অধিবাসীদের পক্ষে রোমে গিয়ে ভোট দেওয়া সম্ভব হত না। সত্যি কথা বলতে কী, রোমে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা ওরা জানতেই পারত না। খবরের কাগজ কিংবা বই-পুস্তকাদি তো আর ছিল না। তা ছাড়া খুব কম লোকেই পড়তে জানত। ভোটের অধিকার থাকা সত্ত্বেও দূরের অধিবাসীরা তার সুযোগ নিতে পারত না।

 তবেই দেখতে পাচ্ছ, নির্বাচন কিংবা অন্যান্য ব্যাপারে শুধু রোমের বাসিন্দারাই প্রকৃতপক্ষে অংশ গ্রহণ করত। ভোটের ব্যবস্থা হত খোলা মাঠে ঘেরাও-করা জায়গায়। ভোটদাতাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল প্লিবিয়ান বা দরিদ্র নাগরিকের দল। প্যাট্রিসিয়ান বা ধনী সম্প্রদায় ছিল ক্ষমতালিপ্সু আর উচ্চপদপ্রার্থী; সুতরাং তারা ঐ দরিদ্র লোকদিগকে ঘুষ দিয়ে ভোট আদায় করত। আজকালকার নির্বাচন-ব্যাপারে যেমন অনেক সময় ঘুষ আর চতুরতা চলে, তখন রোমেও সেটা চলত।

 রোম-রাষ্ট্র যেমন বেড়ে চলল ইতালিতে, তেমনি আবার কার্থেজ ক্ষমতাশালী হতে লাগল উত্তর-আফ্রিকায়। কার্থেজের অধিবাসীরা ছিল ফিনিসীয়দের বংশধর—জাহাজি ব্যবসায়ী। এদের শাসনপ্রণালী ছিল প্রজাতান্ত্রিক, কিন্তু কার্যত সেটা ছিল ধনী সম্প্রদায়ের প্রজাতন্ত্র, রোমের চেয়েও এক ডিগ্রি চড়া। এই নগর-রাষ্ট্রের অধিবাসীদের মধ্যে ক্রীতদাস ছিল অসংখ্য।

 প্রাচীনকালে দক্ষিণ-ইতালি এবং মেসিনাতে গ্রীক উপনিবেশ ছিল। রোম আর কার্থেজ একযোগে গ্রীকদিগকে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাদের এই মৈত্রীবন্ধন বেশি দিন অটুট ছিল না, শীঘ্রই শিথিল হয়ে পড়ল এবং শুরু হল বিরোধ। ভূমধ্যসাগর এত চওড়া ছিল না যে, দু তীরে মুখোমুখি দুটো শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকতে পারে। উভয় রাষ্ট্রই ক্ষমতাভিলাষী ছিল। রোম-রাষ্ট্র ক্রমশ বিস্তারলাভ করছিল। তার যেমন ছিল উচ্চাভিলাষ, তেমনি দৃঢ়তা। কার্থেজ প্রথমে রোম-রাষ্ট্রকে উপেক্ষাই করেছে; সমুদ্রে আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে বলেই তার ধারণা ছিল। শ-খানেক বছর দুটো রাষ্ট্র পরষ্পর মারামারি কাটাকাটি করেছে, মাঝে মাঝে আবার রফা-নিষ্পত্তিও হয়েছে। এদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে তিনবার, ইতিহাসে তাকে পিউনিক যুদ্ধ বলা হয়। প্রথম পিউনিক যুদ্ধ তেইশ বৎসর যাবৎ চলেছিল, খৃষ্টপূর্ব ২৬৪ থেকে ২৪১ সন পর্যন্ত। এই যুদ্ধে রোমের জয় হয়। দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধ হয় বাইশ বছর পরে; ইতিহাসপ্রসিদ্ধ হানিবল ছিলেন কার্থেজবাসীদের সেনাপতি। তিনি পনেরো বছর কাল যাবৎ রোম-রাষ্ট্রকে নানারকমে উত্যক্ত করলেন; রোমানগণ ছিল ভয়ে জড়োসড়ো। রোমের সৈন্যবাহিনীকে তিনি লণ্ডভণ্ড করে দিলেন, বিশেষ করে খৃষ্টপূর্ব ২১৬ সনে কেণীর যুদ্ধে। কিন্তু এই পরাজয় এবং দুর্ঘটনা সত্ত্বেও রোমানরা বশ্যতা স্বীকার করে নি, বরং শত্রুর সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ করেছে। সম্মুখে-যুদ্ধে তারা হানিবলকে আক্রমণ করতে সাহস পায় নি; তাঁকে নানান রকমে হয়রান করতে চেষ্টা করেছে, কার্থেজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় বাধা দিয়েছে। এই সময়ে রোমান সেনাপতি ছিলেন ফ্যাবিয়াস; এই সেনাপতি দশ-বছর-কাল সম্মুখ যদ্ধ এড়িয়ে চলেছিলেন। ইনি খুব নামজাদা লোক ছিলেন না; তবু-যে আমি এঁর নাম উল্লেখ করছি তার কারণ, এঁর নাম থেকে ইংরেজি ফ্যাবিয়ান-শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। ফ্যাবিয়ান পন্থীদের কার্যপ্রণালী হল সাক্ষাৎভাবে কোনো প্রশ্নের মীমাংসা না করা—তারা সম্মুখ যুদ্ধে এড়িয়ে চলে, কোনো সংকটের সম্মুখীন হয় না। ইংলণ্ডে ফ্যাবিয়ানপন্থীদের একটা সমিতি আছে; এরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, অথচ আশু একটা পরিবর্তন চায় না।

 হানিবল ইতালিকে প্রায় মরুভূমিতে পরিণত করেছিলেন; কিন্তু রোমও ছিল নাছোড়বান্দা এবং শেষ পর্যন্ত রোমই জয়লাভ করে। খৃষ্টপূর্ব ২০২ সনে জামা নামক স্থানে এক যুদ্ধে হানিবল পরাস্ত হন। কিন্তু তাতেই এ ব্যাপারের শেষ হয় নি। রোম হানিবলকে মোটেই নিষ্কৃতি দিল না, অনবরত তার পিছনে লেগে রইল। তিনি যেখানে যান সেখানেই রোম তাড়া করে; অবশেষে বিষ খেয়ে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।

 কার্থেজ একেবারে দমে গেল, রোমের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার ক্ষমতা রইল না কোনো। অর্ধশতাব্দীকাল এ দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে আর কোনো বিবাদ হয় নি। কিন্তু রোমের মনের ঝাল