বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৮৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৬৮
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

মেটে নি, তাই একটা অস্ত্র হাতে আবার কার্থেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল; এইটাই তৃতীয় পিউনিক যুদ্ধ। দারণ হত্যাকাণ্ডের ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হল কার্থেজ। এমনকি, যে স্থানে একদা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের রানী সমৃদ্ধিশালী কার্থেজ নগরী অবস্থিত ছিল, লাঙ্গল দিয়ে চষে ফেলা হল সে স্থান।


২৮

রোম-শাসনতন্ত্রের রূপান্তর

৯ই এপ্রিল, ১৯৩২

 কার্থেজের পরাজয় এবং ধ্বংসের পর পশ্চিম ভূখণ্ডে রোম সর্বেসর্বা হয়ে উঠল, প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ রইল না। গ্রীক রাষ্ট্রগুলো তো আগেই রোমের বশ্যতা স্বীকার করেছিল; এখন কার্থেজের অধীনস্থ দেশগুলোও রোম দখল করে বসল। দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের পর স্পেন এসে গেল রোমের অধিকারে। কিন্তু তথাপি কেবলমাত্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিই রোমের অধীনতা স্বীকার করেছিল; সমগ্র উত্তর এবং মধ্য ইউরোপ ছিল স্বাধীন।

 যুদ্ধজয় আর দেশ অধিকারের ফলে রোম ঐশ্বর্যশালী হয়ে উঠল; বিজিত দেশসমূহ থেকে প্রচুর ধনসম্পদ আর ক্রীতদাসের আমদানি হতে লাগল, আর সেই সঙ্গে এল বিলাসিতা। তোমাকে পূর্বে বলেছি, রোমে শাসনক্ষমতা ছিল সিনেটসভার হাতে, এবং এই সিনেটের সভ্য ছিলেন ধন অভিজাতসম্প্রদায়ের লোকেরা। রোমের ক্ষমতা আর অধিকার যত বেড়ে চলল, এই ধনীসম্প্রদায়ের ধনসম্পদও বাড়তে লাগল সেই অনুপাতে। কাজেকাজেই ধনীরা হল অধিকতর ধনী; আর গরিব সেই গরিবই থেকে গেল, কিংবা আরও বেশি দুঃস্থ হয়ে পড়ল, বাড়ল দাস-অধিবাসীদের সংখ্যা। বিলাসবৈভব আর দুঃখদুর্গতি পাশাপাশি বেড়ে চলল।

 আশ্চর্য, কতকাল আর মানুষ এই অবস্থা সহ্য করবে? তবে কিনা মানুষের সহ্যেরও একটা সীমা আছে এবং সেই সীমা ছাড়িয়ে গেলেই সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায়।

 ধনীসম্প্রদায় নানারকম খেলাধুলো, সার্কাস ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দরিদ্র জনসাধারণ আর দাসদের ভুলিয়ে শান্ত রাখত। একদল লোক অস্ত্রের খেলা দেখাত, দ্বন্দ্বযুদ্ধ করত; ওদের বলা হত গ্লাডিয়েটর। সার্কাসে ওদের দ্বন্দ্বযুদ্ধের ব্যবস্থা করা হত; কত ক্রীতদাস আর যুদ্ধ বন্দীকেই না হত্যা করা হয়েছে এ ধরনের দ্বন্দ্বযুদ্ধে, খেলার ছলে।

 কিন্তু আভ্যন্তরিক গোলযোগ বেড়ে চলেছিল রোম-রাষ্ট্রে। রাজদ্রোহিতা আর হত্যাকাণ্ড লেগেই ছিল; নির্বাচনে ঘুষ আর অসাধু উপায়ের তো যেন কথাই ছিল না। এমনকি চিরপদদলিত ক্রীতদাসরাও একবার স্পার্টাকাস্-নামক জনৈক দ্বন্দযুদ্ধকারীর অধীনে বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নিতান্ত নিষ্ঠুরভাবে সেই বিদ্রোহ দমন করে; কথিত আছে ছয় হাজার বিদ্রোহীকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল।

 এই সময়ে কয়েকজন সেনাধ্যক্ষ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে; সিনেটসভাকে তারা আমল দিত না। বাধল গহযুদ্ধ; সৈন্যাধাক্ষরা পরস্পর মারামারি-কাটাকাটি শুরু করল, উজাড় করে দিল দেশ। খৃষ্টপূর্ব ৫৩ সনে প্রাচ্য ভূখণ্ডে পার্থিয়ায় (মেসোপটেমিয়া) কেরির যুদ্ধে রোমান সৈন্যবাহিনী দারুণভাবে পরাজিত হয়েছিল।

 পূর্বকথিত সৈন্যাধ্যক্ষদের মধ্যে দুজনের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য—পম্পে আর জালিয়স সিজার। সিজার ফ্রান্স এবং ইংলণ্ড জয় করেছিলেন, তা তুমি জানো। পম্পে গিয়েছিলেন পুবদিকে। কিন্তু এই দুজনের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, একে অন্যকে সহ্য করতে পারতেন না; আবার উভয়েই ছিলেন ক্ষমাভিলাষী। সিনেটসভা আড়ালে পড়ে গেল, কেউ বড়ো একটা মানে না।