সিজার পম্পেকে পরাস্ত করে রোম-রাষ্ট্রে সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন। কিন্তু তখন রোমে শাসনব্যবস্থা ছিল সাধারণতান্ত্রিক, তাই সরকারিভাবে সকল ব্যাপারে তিনি ক্ষমতা লাভ করতে পারলেন না। তাঁকে রোমের রাজা কিংবা সম্রাট করার চেষ্টা হল, তিনিও সম্রাট হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাধল বহু কাল প্রচলিত শাসনপ্রথায়। সত্যি বলতে কী, ঐ শাসনব্যবস্থার চিরাচরিত প্রথাকে অমান্য করবার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ব্রুটাস এবং অন্যান্যেরা ছুরিকাঘাতে সিজারকে হত্যা করেছিল। শেক্সপিয়রের ‘জুলিয়স সিজার’-নাটকে এই দৃশ্যটির বর্ণনা আছে, তুমি নিশ্চয় তা পড়েছ। খৃষ্টপূর্ব ৪৪ সনে সিজারকে হত্যা করা হয়েছিল।
সিজারের মৃত্যু হল বটে, কিন্তু প্রজাতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা গেল না। সিজারের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন তাঁর পোষ্যপুত্র অক্টেভিয়ান আর বন্ধু মার্ক এণ্টনি। আবার সৃষ্ট হল সেই রাজপদ, অক্টেভিয়ান হলেন রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি। লোপ পেল প্রজাতন্ত্র। সিনেটসভা থাকল বটে, কিন্তু তার প্রকৃত কোনো ক্ষমতা রইল না।
অক্টেভিয়ান রাজা হয়ে ‘অগাস্টাস সিজার’ এই নূতন নাম এবং উপাধি গ্রহণ করলেন। পরে তাঁর বংশধরদের সকলকেই বলা হত সিজার। প্রকৃতপক্ষে, সিজার কথার মানে দাঁড়াল সম্রাট। কাইজার এবং জার এই দুটি কথারও উৎপত্তি হয়েছে এই ‘সিজার’ শব্দ থেকে। কাইজার কথা অনেককাল যাবৎ হিন্দুস্থানি ভাষায় ও প্রচলিত আছে, যেমন— কাইজার-ই-হিন্দ্, কাইজার-ই-রুম। ইংলণ্ডের রাজা জর্জ মনের আনন্দে এই কাইজার-ই-হিন্দ্ উপাধি গ্রহণ করেছেন। জর্মনির কাইজার আর নেই; তেমনি অস্ট্রিয়া আর তুরস্কের কাইজার এবং রুশিয়ার জারও বিদায় নিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য। শুধু ইংলণ্ডের রাজা অদ্যাবধি সেই নাম কিংবা জুলিয়স সিজার উপাধি আঁকড়ে ধরে আছেন। অথচ এই জুলিয়স সিজারই রোমের পক্ষ থেকে ইংলণ্ড জয় করেছিলেন।
দেখা যাচ্ছে, জুলিয়স সিজারের নামটা রাজকীয় মহিমা-জ্ঞাপক একটি শব্দে পরিণত হয়েছে। আচ্ছা, পম্পে যদি গ্রীসে সিজারকে পরাস্ত করতেন তবে কেমন হত? সম্ভবত তখন পম্পে সম্রাট হতেন, আর ‘পম্পে’ কথাটির অর্থ হত সম্রাট। জর্মনির কাইজারের পরিবর্তে আমরা পেতাম জর্মনির পম্পে, এবং এমনকি রাজা জর্জই হয়তো-বা উপাধি নিতেন পম্পে-ই-হিন্দ্।
রোম-রাষ্ট্রে যখন এইসব পরিবর্তন ঘটছে, প্রজাতন্ত্র পরিণত হচ্ছে সাম্রাজ্যে, তখন মিশরে ছিল এক নারী, নাম ক্লিওপেট্রা। সৌন্দর্যের জন্যে ইতিহাসে এর নাম থেকে গেছে। কখনও কখনও গুটিকতক স্ত্রীলোক তাদের দৈহিক সৌন্দর্যের জোরে ইতিহাসের মোড় ফিরিয়ে দিয়েছে; ক্লিওপেট্রা ছিল তাদেরই একজন, যদিও সম্ভ্রম কিংবা প্রতিষ্ঠার দাবি তার তেমন ছিল না। জুলিয়স সিজার যখন মিশরে যান তখন ক্লিওপেট্রা বালিকামাত্র। পরে অবশ্য মার্ক এণ্টনির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব জন্মে, কিন্তু তাতে এণ্টনির কিছু ভালো হয় নি। বস্তুত, এক নৌযুদ্ধে ক্লিওপেট্টা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজের জাহাজ নিয়ে সরে পড়েছিল।
মিশর পরিদর্শনের পর থেকে সিজার সম্ভবত নিজেকে রাজা কিংবা সম্রাট বলে ভাবতে শুরু করেছিলেন। মিশরের শাসনব্যবস্থায় ছিল রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র নয়; শাসনকর্তা কেবলমাত্র সর্বেসর্বাই ছিলেন না, তাঁকে দেবতা বলে মানা হত। এই ছিল প্রাচীন মিশরীয় রীতি। আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর মিশরের শাসনভার গেল গ্রীক টলেমিদের হাতে। ওরা অনেকাংশে মিশরীয় মতবাদ, রীতিনীতি ইত্যাদি গ্রহণ করেছিল। ক্লিওপেট্রা ঐ টলেমি-বংশের মেয়ে, সতরাং সে ছিল একজন গ্রীক নারী।
শাসনকর্তাকে দেবতারূপে মানার মনোবৃত্তিটা রোমও গ্রহণ করল; এতে ক্লিওপেট্রার কোনো হাত ছিল কি না সঠিক বলা যায় না। এমনকি জুলিয়াস সিজারের জীবদ্দশাতেই তাঁর প্রতিমূর্তি গড়ে পুজো করা শুরু হল। দেখতে পাবে, পরবর্তীকালে এটা রোমান সম্রাটগণের নিকট একটা প্রথায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
রোমের ইতিহাসের একটা সন্ধিক্ষণে এসে আমরা পৌঁচেছি। প্রজাতন্ত্রের তখন অন্তর্দশা। অক্টেভিয়ান খৃষ্টীয় ২৭ সনে রাজা হলেন, উপাধি নিলেন অগাস্টাস সিজার। রোম সাম্রাজ্য ও