বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৮৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
রোম-শাসনতন্ত্রের রূপান্তর
৭১

তার সম্রাটদের কাহিনী পরে বলব; প্রজাতন্ত্রের শেষ আমলে রোমের অধীন রাজ্যগুলোর অবস্থাটা আগে আলোচনা করা যাক।

 ইতালি তো রোমের অধীনে ছিলই, আর ছিল পাশ্চাত্যের স্পেন এবং গল (ফ্রান্স), এই দুটি দেশ। পূর্বদিকে গ্রীস আর এশিয়া মাইনর রোমের অধিকারে ছিল; এশিয়া মাইনরে গ্রীক রাষ্ট্র পার্‌গেমাম্-এর কথা নিশ্চয় তোমার মনে আছে। উত্তর-আফ্রিকার মিশরকে রোমের আশ্রিতরাজ্য হিসাবে ধরা হত; ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কার্থেজ এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশ রোমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাজে কাজেই, উত্তরে রোম-রাষ্ট্রের সীমানা ছিল রাইন নদী। জর্মনি, রাশিয়া, উত্তর ও মধ্য ইউরোপ এবং মেসোপটেমিয়ার পূর্বদিকের সমস্ত দেশ ও জাতি রোম-রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে ছিল।

 সেকালে রোম ছিল বিরাট সাম্রাজ্য। ইউরোপের লোকেরা সমগ্র পৃথিবীটাকেই রোমের অধীন বলে মনে করত। অন্যান্য দেশের ইতিহাস সম্বন্ধে ওদের কোনো জ্ঞান ছিল না কিনা? আদতে কিন্তু ব্যাপার তা নয়। চীনের হান বংশের কথা নিশ্চয় তোমার মনে আছে। ঠিক এই সময়টাই ছিল হান্-বংশের রাজত্বকাল এবং এদের ক্ষমতা আর অধিকার এশিয়া থেকে বরাবর কাস্পিয়ান সাগর অবধি বিস্তৃত ছিল। মেসোপটেমিয়ায় কেরির যুদ্ধে রোমানদের দারুণ পরাজয় হয়েছিল। মঙ্গোলীয়গণ সে যুদ্ধে পার্থিয়াবাসীদের সাহায্য করেছিল, এই আমার আন্দাজ।

 রোমের ইতিহাস, বিশেষ করে রোমের প্রজাতন্ত্রের-যুগের ইতিহাসের প্রতি ইউরোপীয়দের একটা টান আছে; ওরা মনে করে প্রাচীন রোম-রাষ্ট্র আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্মদাতা। কথাটার মধ্যে কিছু সত্য আছে। তাই তো ইংলণ্ডে স্কুলের ছাত্রদের গ্রীস আর রোমের ইতিহাস পড়ানো হয়, অথচ, আধুনিক যুগের ইতিহাস হয়তো তারা জানেই না। আমার মনে আছে, ইংলণ্ডে আমাকে লাতিন ভাষায় জুলিয়স সিজারের গল্-আক্রমণের কাহিনী পড়তে হয়েছিল। সিজার কেবল যোদ্ধাই ছিলেন না, সাহিত্যরচনায়ও তাঁর চমৎকার হাত ছিল। আজও ইউরোপের হাজার হাজার বিদ্যালয়ে তাঁর রচিত ‘দ্য বেলো গ্যালিকো’ পড়ানো হয়।

 অশোকের রাজত্বকালে পৃথিবীর অপরাপর দেশের অবস্থার পর্যালোচনা শুরু করেছিলাম। তা শেষ করে আমরা চীন এবং ইউরোপে চলে গিয়েছি। এখন খৃষ্টীয় যুগের শুরুতে চলো আবার ভারতবর্ষে ফিরে যাই; অশোকের মৃত্যুর পর সে দেশে অনেক-কিছু পরিবর্তন ঘটেছে, উত্তর আর দক্ষিণ ভারতে নূতন নূতন সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে।

 পৃথিবীর ইতিহাস অবিচ্ছিন্ন, এই ধারণা আমি তোমার মনে জন্মাতে চাই। কিন্তু মনে রেখো, সেই প্রাচীন যুগে দূরদূরান্তরের দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষার তেমন কোনো উপায় ছিল না। রোম অনেক বিষয়েই খুব উন্নত ছিল বটে, কিন্তু ভূবিদ্যা আর ভূচিত্রাবলীর জ্ঞান ছিল না বললেই হয়, শেখবার চেষ্টাও করে নি। সৈন্যাধ্যক্ষরা ছিলেন দিগ্বিজয়ী বীর, সিনেটের সদস্যরাও ছিলেন বটে জ্ঞানী ব্যক্তি, কিন্তু ভূগোলের জ্ঞান তাঁদের সামান্যই ছিল; আজকালকার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও তার চেয়ে ঢের বেশি জানে। রোম সম্রাটগণ যেমন নিজেদের পৃথিবীর অধীশ্বর বলে মনে করতেন, ঠিক তেমনি হাজার হাজার মাইল দূরে এশিয়া মহাদেশে চীনের সম্রাটগণও ভাবতেন, তাঁরাই পৃথিবীর অধিপতি।