বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

প্র স্তা ব না

এই পত্রগুলি কবে ও কোথায় প্রকাশিত হইবে, বা আদৌ প্রকাশিত হইবে কিনা, জানি না। নানা বিচিত্র ঘটনার ভরে ভারতবর্ষ আজ টলমল করিতেছে; ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কোন কথা বলাই এখন কঠিন ব্যাপার। তবুও এই কয়টি কথা লিখিয়া রাখিতেছি—এখনও আমার লিখিবার মত অবসর আছে, হয়তো পরে আর থাকিবে না।

 এই পত্রাবলী ইতিহাস লইয়া রচিত, ইহার জন্য একটু কৈফিয়ত ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পত্রগুলি পড়িতে পড়িতে হয়তো পাঠক নিজেই আমার সে কৈফিয়ত ও ব্যাখ্যাটি বুঝিয়া লইবেন। বিশেষ করিয়া ইহার শেষ পত্রটি পড়িয়া দেখিতে বলিব; হয়তো এই বইটি সেই শেষ অধ্যায় হইতে আরম্ভ করাই সুযুক্তি, কারণ জগৎটাই এখন উল্টোপাল্টা হইয়া আছে।

 পত্রগুলি ক্রমশ বাড়িয়া উঠিয়াছে। এইগুলি লিখিবার পূর্বে আমি কোন সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা করিয়া লই নাই; এইগুলি এমন বৃহৎ আকার ধারণ করিবে সে-ধারণাও আমার ছিল না। প্রায় ছয় বৎসর পূর্বের কথা, আমার কন্যার বয়স তখন দশ বৎসর। সেই সময়ে আমি তাহাকে কতকগুলি পত্র লিখিয়াছিলাম, তাহাতে বিশ্বজগতের প্রথম যুগ সম্বন্ধে কিছু সংক্ষিপ্ত ও সরল বিবরণ ছিল। প্রথম-কালের সেই পত্রগুলি পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়, পাঠকের নিকটেও সেটি আদৃত হইয়াছিল। সেইরূপে পত্র আরও কিছুদূর লিখিয়া চলিব, এই কল্পনা আমার মনে জাগিয়াছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কার্যকলাপ লইয়া আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমি এত ব্যস্ত যে, কল্পনাকে কার্যে রূপ দিবার অবসর পাই নাই। কারাবাসে সেই অবসর পাইলাম, তাহার সদ্ব্যবহারও করিলাম।

 কারা-জীবনের কতকগুলি সুবিধা আছে: সেখানে কাজের অবসর পাওয়া যায়, মনকে কিছুটা সমাহিত করিয়া আনা যায়। কিন্তু ইহার অসুবিধাগুলিও অতি প্রখর। পুঁথিপত্রের বালাই বন্দীর থাকে না; সে অবস্থায় বই লিখিতে, বিশেষতঃ ইতিহাসের বই লিখিতে বসা দুঃসাহসের কাজ। কিছু কিছু বই অবশ্য আমার হাতে পৌঁছিত, কিন্তু সেগুলিকে হাতের কাছে আটকাইয়া রাখা সম্ভব ছিল না—বই আসিত, আবার চলিয়া যাইত।

 কিন্তু বারো বৎসর পূর্বে আমার দেশের বহু পুরুষ ও নারীর সহিত একত্রে আমি কারাতীর্থের পথে যাত্রা আরম্ভ করিয়াছিলাম; সেই সময়ে একটি বস্তু অভ্যাস করিয়াছিলাম—যে-বই পড়িলাম তাহার সংক্ষিপ্ত টীকা লিখিয়া রাখা। আমার এই টীকার খাতা ক্রমশ সঞ্চিত হইয়াছে; যখন লিখিতে বসিলাম, এই খাতাগুলি আমার সহায় হইল। অবশ্য ইহা ছাড়া আরও বহু বই হইতেও আমি প্রচুর সাহায্য পাইয়াছি, এইচ. জি. ওয়েল্‌স্-এর OUTLINES OF HISTORY ইহাদের অন্যতম। তবুও, দেখিয়া লইবার মত ভাল পুঁথিপত্রের অভাব অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভব করিয়াছি; এই অভাবের জন্যই বহু স্থলে বহু আলোচনাকে অস্পষ্ট রাখিতে হইয়াছে, বহু কালের কাহিনীকে বাদ দিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছি।

 এই চিঠিগুলি একটি বিশেষ ব্যক্তিকে লেখা, ইহার মধ্যে বহুস্থানে এমন একান্ত কথা আছে যাহা শুধু আমার কন্যাকেই উদ্দেশ করিয়া বলা হইয়াছে। সেগুলিকে লইয়া এখন কী করি সেও এক সমস্যা; পত্র হইতে সেগুলিকে বাদ দিতে গেলে এখন আবার অনেক কাটাকুটি করিতে হয়। সুতরাং আমি সেগুলি কিছুই করিলাম না, যেমন ছিল তেমনই রাখিয়া দিলাম।

 দৈহিক নিষ্ক্রিয়তার ফলে অন্তর্দৃষ্টির অভ্যাস বাড়ে, মানষের মন ও চেতনায় ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটিতে থাকে। এক এক সময়ে আমার মনে এক এক রূপ ভাব দেখা দিয়াছে,