বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৯০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

২৯

দক্ষিণ ভারতের প্রাধান্যলাভ

১০ই এপ্রিল, ১৯৩২

 সুদূর প্রাচ্যের চীনদেশ আর পাশ্চাত্যের রোম পরিভ্রমণ করে অনেক কাল পরে ভারতে ফিরে এলাম।

 অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। উত্তর-ভারতের প্রদেশগুলো হীনবল হয়ে পড়ে; এদিকে দাক্ষিণাত্যে গজিয়ে ওঠে একটা নূতন সাম্রাজ্য—অন্ধ্র-সাম্রাজ্য। অশোকের বংশধরগণ বছর-পঞ্চাশেক মগধে রাজত্ব করেছিল, তার পর শেষ মৌর্যরাজের সেনাপতি বলপূর্বক সিংহাসন দখল করেন। ইনি ছিলেন ব্রাহ্মণ, নাম পুষ্যমিত্র। এঁর রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরভ্যুদয় হয়; বৌদ্ধসন্ন্যাসীদের উপর কিছুটা অত্যাচার-অবিচারও করা হয়েছিল। ভারতের ইতিহাস পড়তে পড়তে তুমি দেখতে পাবে, বৌদ্ধধর্মের উপর ব্রাহ্মণ্যধর্মের আক্রমণের রীতিটা ছিল কূটনৈতিক, অশিষ্ট অত্যাচার কখনও করে নি। কিছুটা অত্যাচার অবিচার যে হয় নি তা নয়, তবে সম্ভবত তার হেতু ছিল রাজনৈতিক। বৌদ্ধসংঘগুলো ছিল খুব শক্তিশালী; এগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতাও ছিল যথেষ্ট। সম্রাটদের মধ্যে অনেকে এই সংঘগুলোকে রীতিমতো ভয় করে চলতেন এবং তাই ওদের ক্ষমতা লোপ করবার জন্যে বরাবর চেষ্টা করেছেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মকে দেশছাড়া করল, তবে বৌদ্ধধর্মের আদর্শ কতকটা গ্রহণ করতে হয়েছিল।

 এই নূতন ব্রাহ্মণ্যধর্ম পুরাতনের পুনরাবৃত্তি নয়, কিংবা বৌদ্ধধর্মের আদর্শকে অস্বীকারও করে নি। ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রাচীন নায়কগণের রীতি ছিল, নূতনকে গ্রহণ করা, খাপ খাইয়ে নেওয়া। আর্যগণ প্রথম যখন ভারতে এল তখন তারা দ্রাবিড়জাতির আচারপদ্ধতি ও সংস্কৃতি অনেকাংশে গ্রহণ করেছিল; জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক, এই রীতিই তারা পালন করেছে, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। বৌদ্ধধর্মের প্রতিও তাদের এই মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে—বুদ্ধকে করেছে অবতার আর দেবতা। অগণিত জনসাধারণ তাঁকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করেছে, অথচ তাঁর বাণী ও আদর্শকে পালন করে নি। ওদিকে ব্রাহ্মণ্যধর্ম তথা হিন্দুধর্ম ও তার আদর্শ এবং ভাবধারা বজায় রেখেছে। বৌদ্ধধর্মের উপর ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাববিস্তারের এই চেষ্টা অনেককাল ধরে চলেছিল, কেননা, অশোকের মৃত্যুর পরেই তো আর বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে লোপ পায় নি। আরও কয়েক শো বছর ছিল এ দেশে।

 অশোকের মৃত্যুর পরে মগধে কোন বংশের প্রভুত্ব স্থাপিত হল, কারাই বা রাজা হল তা আলোচনা করার দরকার নেই। দুশো বছরের মধ্যেই মগধ সাম্রাজ্যের প্রতিপত্তি লোপ পেয়ে গেল; অবশ্য পরেও বৌদ্ধসংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে তার খ্যাতি ছিল।

 এদিকে উত্তর-ভারত আর দাক্ষিণাত্যে মহা আন্দোলন চলছিল। শক, তুর্কি, কুষাণ, ব্যাকট্রিয়ার গ্রীকজাতি, সিথিয়াবাসী প্রভৃতি মধ্য-এশিয়ার নানা জাতির আক্রমণে উত্তর-ভারত উত্ত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। মধ্য-এশিয়া ছিল নানা জাতির জন্মস্থান; এরা কীরূপে ক্রমে ক্রমে সমগ্র এশিয়ায়, এমনকি ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে এবং ইতিহাসের পাতায় বারে বারে এদের আবির্ভাব হয়, সে কথা তোমাকে পূর্বে বলেছি। খৃষ্টের জন্মের পূর্বে প্রায় দু শো বছর কাল যাবৎ এভাবে ভারত অনেকবার আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, এইসমস্ত আক্রমণের উদ্দেশ্য দেশ-জয় কিংবা লুঠপাট নয়, আসল উদ্দেশ্য ছিল জায়গা দখল করে বসবাস করা। মধ্য-এশিয়ার জাতিদের অধিকাংশই ছিল যাযাবর, লোকসংখ্যা-বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাসস্থানে এদের সংকুলান হত না; কাজেই এরা এখান থেকে ওখানে যেত, নূতন জায়গার সন্ধানে ফিরত। আর-একটা কারণ এই ছিল যে, পিছন থেকে প্রায়ই এদের উপর চাপ পড়ত; এক জাতি আর-এক জাতিকে স্থানচ্যুত করে দিত এবং বাধ্য হয়েই এরা অন্য দেশ আক্রমণ করত। সুতরাং যেসকল জাতি ভারতবর্ষ